এই সময়: অধিকাংশ বুথফেরত সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে তামিলভূমে ভোট ক্লাইম্যাক্সের হিরো থালাপতি বিজয়–ই! স্ট্যালিন জমানা ফেরার পূর্বাভাসে কার্যত জল ঢেলে দক্ষিণের রাজ্য বুঝিয়ে দিল, রাজনীতিতে নবাগত অভিনেতাকেই আগামী পাঁচ বছরের জন্য সুযোগ দিতে চান তাঁরা। মহিলাদের মাসিক ভাতা, অন্যান্য অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েও মুখ্যমন্ত্রীর আসন ধরে রাখতে পারলেন না ডিএমকে প্রেসিডেন্ট এম কে স্ট্যালিন। নিজের কেন্দ্র কোলাথুরে–ই বিজয়ের দলের প্রার্থী ভিএস বাবুর কাছে ৮ হাজারেরও বেশি ভোটে হারতে হলো করুণানিধি–পুত্রকে! তামিলনাড়ুর ২৩৪ আসনের বিধানসভা ভোটে সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ১১৮। সোমবার সকালে প্রথম কয়েক রাউন্ড ভোটগণনার পরে বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেত্তরি কাজ়হাগাম’ (টিভিকে) ১০০–র গণ্ডি পেরোতেই জল্পনা ছড়াচ্ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গড়বেন বিজয়ই। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দোলাচল শুরু হয়। ভোটগণনার শেষ আপডেট অনুযায়ী, ১০৮টি আসনে এগিয়ে বিজয়ের দল। যেখানে ডিএমকে জোট এগিয়ে ৬৫ আসনে এবং এআইএডিএমকে জোট ৪৫ আসনে।
এখন প্রশ্ন, সরকার গড়ার ম্যাজিক ফিগারে না পৌঁছলে কি জয়ললিতার এআইএডিএমকে বা করুণানিধির ডিএমকে–র সঙ্গে হাত মেলাবেন বিজয়? নাকি বিধায়ক কেনাবেচা দেখবে তামিলভূমও?
প্রাথমিক ট্রেন্ডে টিভিকে এগিয়ে যাওয়ার পরে সোমবার বিজয়কে বলতে শোনা যায়, ‘ডিএমকে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, এটাই বাস্তব। এ বার টিভিকে নিজেরাই সরকার গড়বে।’ কিন্তু সন্ধে পর্যন্ত ভোটগণনার ট্রেন্ডিংয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণ্ডি ছুঁতে পারেনি বিজয়ের দল। তবে মাত্র দু’বছর আগে রাজনৈতিক দল গড়ে প্রথমবার ভোটের ময়দানে নামা দলের এমন ফল নজর কাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের লড়াইয়ে নবাগত হলেও বিজয় তৃণমূল স্তরের কাজটা কিন্তু শুরু করেছিলেন ২০০৯ সাল থেকে। সেই সময়ে একটা ক্লাব গড়ে বিভিন্ন জায়গায় সমাজসেবামূলক কাজ, ত্রাণবিলি করতেন। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে টিভিকে গঠন করেন বিজয়। তার পরের দু’বছর একেবারে জেলাস্তরে গিয়ে চলে সংগঠন মজবুত করার কাজ। ২০২৬–এর বিধানসভা ভোটের আগে এআইএডিএমকে–র সঙ্গে টিভিকে–র জোট জল্পনা জোরদার হয়েছিল। শোনা যায়, জয়ললিতার দলই নাকি টিভিকে–কে জোট প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু একাধিক শর্ত চাপান বিজয়। বিজয়কে মুখ্যমন্ত্রী মুখ করতে হবে, ২৩৪ বিধানসভা আসনের অর্ধেক সিটে টিভিকে প্রার্থী দেবে—এমনই একাধিক শর্ত চাপিয়েছিল বিজয়ের দল, যা মানেনি এআইএডিএমকে। ২০২৬–এর বিধানসভা ভোটের আগে একদিকে যেমন একা ভোটে লড়ার ঘোষণা করে টিভিকে, তেমনই তিন দশকের ফিল্ম কেরিয়ার ছাড়ার কথাও জানিয়ে দেন বিজয়। বুঝিয়ে দেন, অভিনয়ের সঙ্গে পার্টটাইম নয়, বরং ফুলটাইম রাজনীতিক হিসেবেই এ বার ময়দানে নামছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা রাজনীতিক বিজয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে জেন জ়ি–র আবেগকে মাথায় রেখে নতুন কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত সরকারের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। মহিলা ভোটব্যাঙ্কের কথা মাথায় রেখে মাসিক ২,৫০০ টাকার অর্থসাহায্য, গরিব পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে আট গ্রাম করে সোনা এবং শাড়ি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও শুনিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তামিলভূমের রাজনীতি যে শুধুমাত্র ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে— এই দুটো দলের মধ্যেই আবর্তিত নয়, সেটা বুঝিয়ে তৃতীয় বিকল্প দিয়েছেন বিজয়। সেই বিকল্পকেই বেছে নিয়েছেন তামিলনাড়ুর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।
২০২৫–এর সেপ্টেম্বরে কারুরের রাজনৈতিক র্যালিতে পদপিষ্ট হয়ে ৪২ জনের মৃত্যুর ঘটনা বিজয়ের রাজনৈতিক কেরিয়ারের সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কিন্তু মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে, তাঁদের ২০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিজয় যে ভাবে ক্রাইসিস হ্যান্ডেল করেছেন, তাতে রাজনীতিক বিজয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটা বেড়ে গিয়েছে বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
১৯৭৭ সালে এমজি রামচন্দ্রন অভিনয় ছেড়ে এ ভাবে পুরোদস্তুর রাজনৈতিক দল গড়ে মুখ্যমন্ত্রী হন। এর পর জয়ললিতা সিএম কুর্সিতে বসলেও এমজিআরের ছেড়ে যাওয়া দলের দায়িত্বই কাঁধে নিয়েছিলেন তিনি। এখন বিজয় যদি মুখ্যমন্ত্রী হন, তবে ৪৯ বছর পরে এমজিআরের পুনরাবৃত্তি দেখবে তামিলভূম।
তামিলনাড়ুর বাকি দুটো দলের কী হবে?
২০১৬–এর ডিসেম্বরে জয়ললিতা মারা যাওয়ার পরে পালানিস্বামী মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসলেও এআইএডিএমকে–র অন্তর্দ্বন্দ্ব চাপা থাকেনি। ভোটের ঠিক আগে ও পন্নীরসেলভামের দল ছেড়ে ডিএমকে–তে চলে যাওয়া তাদের চাপ আরও বাড়িয়েছে। এআইএডিএমকে–র বিজেপি জোটের সিদ্ধান্ত ঘিরেও ছিল প্রশ্ন। অন্যদিকে, ২০১৮ সালে করুণানিধির মৃত্যুর পরে পুত্র স্ট্যালিন ডিএমকে–র হাল ধরেন। ২০২১–এর ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রীও হন। কিন্তু ভাষাগত অস্মিতা, ডিলিমিটেশনের বিরোধিতা, মহিলাদের ভাতা নিশ্চিত করেও স্ট্যালিন যে ভোটারদের মন পুরোপুরি জিততে পারেনি, সেটা সোমবারের ফলাফলেই স্পষ্ট।