• লোকসভার পরে এ বার হার বিধানসভা নির্বাচনেও, প্রশ্নের মুখে অধীরের ভবিষ্যৎ
    এই সময় | ০৫ মে ২০২৬
  • শুভাশিস সৈয়দ, বহরমপুর

    দীর্ঘদিনের রেওয়াজে যতিচিহ্ন পড়েছিল ২০২৪-এ। গত লোকসভা ভোটে বহরমপুর কেন্দ্রে হেরেছিলেন তিনি। কিন্তু বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রের ছ'টি বিধানসভা এলাকায় হারলেও লিড ছিল বহরমপুর বিধানসভায়। তাই ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে ওই কেন্দ্রেই তাঁকে প্রার্থী করেছিল হাইকম্যান্ড। লোকসভার পরে এ বার সেই বহরমপুর কেন্দ্রও খোয়ালেন কংগ্রেস প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী। বিজেপি প্রার্থী সুব্রত মৈত্রের কাছে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে পরাজিত হন তিনি। ১৯৯১-তে জীবনের প্রথম বিধানসভা ভোটের লড়াইয়ে নবগ্রামে হেরেছিলেন অধীর। চার দশকের রাজনৈতিক কেরিয়ারে এ বার জীবনের দ্বিতীয় বিধানসভা ভোটের পরাজয় দেখলেন তিনি।

    'বহরমপুর মানেই অধীর'— দীর্ঘ আড়াই দশকের এই পরিচিত রাজনৈতিক সমীকরণ তাই কার্যত ভেঙে চুরমার। ভোট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় অধীর বলেন, 'হেরেছি আমি। সারা পশ্চিমবঙ্গজুড়ে যে বিজেপি ঝড় সবাইকে কুপোকাত করেছে, আমিও তাতে কুপোকাত হয়েছি। হতাশ হওয়ার কিছু নেই।' পাশাপাশি তিনি তোপ দাগেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও। তাঁর দাবি, 'বাংলায় প্রথম নির্বাচনী জোট বিজেপির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই করেছিলেন। বিজেপি সরকারে মন্ত্রী ছিলেন তিনি। তাঁর হাত ধরে বিজেপির উত্থান এ রাজ্যে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাংলায় ছিল না। আজ সেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরে যেতে হলো।'

    ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের পরে লোকসভার বিরোধী দলনেতা হয়েছিলেন অধীর। তার আগের টার্মে হয়েছিলেন রেল প্রতিমন্ত্রীও। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক গ্রাফে পতনের শুরু ২০২৪-এর লোকসভা ভোট থেকে। টানা পাঁচবারের সাংসদ অধীরকে সে বার বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে হারিয়ে দেন তৃণমূল কংগ্রেসের ইউসুফ পাঠান। প্রায় ৮৫ হাজার ভোটের সেই পরাজয়ের পর সাংসদ পদ তো বটেই, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদও হারাতে হয় তাঁকে। পর পর দুই ধাক্কায় কোণঠাসা হয়ে পড়েন এক সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই নেতা।

    ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে তাঁকেই আবার প্রার্থী করে কংগ্রেস হাইকমান্ড। জেলার ২২টি আসনে প্রার্থী বাছাইয়ের গুরুদায়িত্বও তাঁর কাঁধে ছিল। প্রার্থী ঘোষণা হওয়ার পরে তাঁর প্রতিপক্ষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সমর্থন জোগাবেন বলে মন্তব্য করেন এক সময়ের সতীর্থ, অধুনা আমজনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর। কিন্তু গণনার আগের দিন রবিবারই অধীরের পরাজয় ও বিজেপির জয় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন হুমায়ুন। সোমবার গণনা শুরুর একটু পর থেকেই পিছিয়ে পড়তে শুরু করেন অধীর। বহরমপুর গার্লস কলেজে ভোটগণনায় প্রথম দফা থেকেই এগিয়ে যান বিজেপির সুব্রত মৈত্র, যে ধারা আর থামেনি। শেষ পর্যন্ত ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজারে।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হারের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর ধর্মীয় মেরুকরণ। ২০২৪-এর লোকসভার ধারা বজায় রেখে ২০২৬-এও বহরমপুরে ভোট বিভাজন হয়েছে স্পষ্ট ভাবে ধর্মের ভিত্তিতে। হিন্দু ভোটারদের বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু ভোট ছড়িয়ে পড়েছে তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে। এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই কংগ্রেসই। এবং শেষ বিচারে সংখ্যালঘু ভোট যত না কাজ করেছে অধীরের পক্ষে, তার চেয়েও ঢের বেশি ঢল নেমেছে তৃণমূল বিরোধিতা। নিট ফল, সব ফায়দা ঘরে তুলেছে গেরুয়া শিবির।

    ১৯৯১–তে নবগ্রাম থেকে পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন অধীর। ১৯৯৬-এ প্রথম জয় বিধানসভা ভোটে। তার পর ১৯৯৯ থেকে টানা ২৫ বছর লোকসভার সাংসদ— দিল্লি থেকে রাজ্য, সর্বত্রই দাপট দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৬-এর পর পর দু'টি হার তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

  • Link to this news (এই সময়)