শ্যামগোপাল রায়
রাজনীতির লড়াইয়ে তিনি যখন মাথা মুড়িয়েছিলেন, তখন অনেকেই সেটাকে ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’ বলে কটাক্ষ করেছিল। কিন্তু প্রায় ৩৮ মাস পরে সোমবার ব্যারাকপুর কেন্দ্রের ভোটগণনা যখন মাঝপথে, তখনই সেই কৌস্তভ বাগচির মুখে চওড়া হাসি। গেরুয়া আবির মেখে বিজেপি সমর্থকদের উল্লাসের মধ্যমণি হয়ে কৌস্তভ ঘোষণা করলেন, ‘দেওয়াল লিখন স্পষ্ট। এ বার মাথায় চুল রাখব আবার।’ সন্ধের মুখে দেখা গেল, তৃণমূলের তারকা–বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীকে হারিয়ে জিতে গিয়েছেন পদ্ম–প্রার্থী কৌস্তভ।
২০২৩–এর ৪ মার্চ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে উৎখাত করার শপথ নিয়ে মাথা মুড়িয়েছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী-রাজনীতিক কৌস্তভ। তখন তিনি কংগ্রেসে। তার কিছু দিন পরেই যোগ দেন বিজেপিতে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে নেড়া মাথাই হয়ে গিয়েছিল তাঁর আইডেন্টিটি। সোমবার ব্যারাকপুর বিধানসভা কেন্দ্রের সপ্তম রাউন্ডের গণনা শেষে দেখা যায়, তৃণমূলের রাজ চক্রবর্তীর চেয়ে প্রায় ১৪ হাজার ভোটে এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। তখনই কৌস্তভের স্ত্রী প্রীতি জানিয়ে দেন, স্বামীর জন্যে বিশেষ উপহার কিনে ফেলেছেন তিনি— ‘ব্র্যান্ডেড শ্যাম্পু’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের হার হচ্ছে, এ বার আবার মাথায় চুল রাখবেন কৌস্তভ।
কৌস্তভের মাথায় চুল না–রাখার পণ বর্ষীয়ানদের মনে করিয়ে দিচ্ছে সোশালিস্ট পার্টির সেই রাজ নারায়ণের কথা। ১৯৭১–এ সরকারি খরচে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এলাহাবাদে ভোটের প্রচারে মঞ্চ তৈরি–সহ সরকারি সুযোগ–সুবিধা নেওয়ায় তা চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন পরাজিত প্রার্থী রাজ নারায়ণ। সেই মামলায় প্রায় দু’বছর পরে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ইন্দিরা গান্ধীর জয় খারিজ করে দেয়। এর পরেই ইন্দিরা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। অনেকের সঙ্গেই গ্রেপ্তার হন রাজ নারায়ণও। জেলে যাওয়ার সময়ে রাজ নারায়ণ পণ করেন, যতদিন না কংগ্রেস ক্ষমতা থেকে সরছে, ততদিন তিনি দাড়ি–গোঁফ কামাবেন না। ১৯৭৭–এ কংগ্রেসের ভরাডুবির পরে জেল থেকে বেরিয়ে এলাহাবাদের গঙ্গার ধারে বসে দাড়ি–গোঁফ কামান রাজ নারায়ণ। ব্যারাকপুরের কৌস্তভের মধ্যে সেই রাজ নারায়ণের ছায়া দেখছেন অনেকেই।
গত কয়েক বছর ধরেই তৃণমূল–বিরোধী এই তরুণ রাজনীতিক কখনও তৃণমূলের হাতে মার খেয়েছেন, কখনও তাঁর বাড়ি গিয়ে হামলা চালিয়েছে দুষ্কৃতীরা। কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে আসার আগেও শাসকের টার্গেট হয়েছিলেন। কখনও পুলিশ নোটিস পাঠিয়ে লাগাতার তলব করেছে, আবার কখনও মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মন্তব্য করায় তাঁকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এমনকী তাঁর বাড়িতে দুষ্কৃতীদের হামলার পরে ২০২৩–এর মার্চ থেকে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তাঁকে ও তাঁর বাড়িতে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়। অবশেষে ব্যারাকপুর কেন্দ্রে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে জয়ের পরে গণনাকেন্দ্র থেকে শংসাপত্র নিয়ে বেরিয়ে কৌস্তভ বলেন, ‘তৃণমূলের দম্ভ ও ঔদ্ধত্যের ফল তাদের এই পরাজয়। অন্য দিকে, এই জয় নরেন্দ্র মোদী–আমিত শাহর নেত্ৃত্বের জয়।’ আর তাঁর পণ সম্পর্কে হেসে বলেন, ‘এ বার মাথায় আবার চুল রাখব।’