পিনাকী ধোলে, বলরাম দত্তবণিক: সিউড়ি ও রামপুরহাট: বীরভূম জেলা মানেই তৃণমূলের দুর্ভেদ্য দুর্গ, বহুদিনের চেনা রাজনৈতিক সমীকরণ কার্যত চুরমার হয়ে গেল। অনুব্রত মণ্ডল কিংবা কাজল শেখ, ভোটের ময়দানে তৃণমূলের দুই যুযুধান সেনাপতিই বুক ঠুকে দাবি করেছিলেন, বীরভূমের ১১টি আসনেই ফুটবে জোড়াফুল। কিন্তু ইভিএম খুলতেই দেখা গেল অন্য ছবি। কেষ্ট-কাজলের রণকৌশলকে কার্যত খণ্ডবিখণ্ড করে জেলার গুরুত্বপূর্ণ ৬টি আসনে জয় ছিনিয়ে নিল বিজেপি। সিউড়ি, দুবরাজপুর, ময়ূরেশ্বর, সাঁইথিয়া, লাভপুর এবং রামপুরহাটে জয়লাভ করল গেরুয়া শিবির। তবে হাসন, মুরারই, নলহাটি, বোলপুর ও নানুর আসন নিজেদের দখলে রাখতে পেরেছে তৃণমূল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বীরভূমের এই নির্বাচনে স্থানীয় উন্নয়নের চেয়েও ধর্মীয় ও সামাজিক মেরুকরণ বেশি কাজ করেছে। রাজ্য সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী কিংবা ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’-এর মতো উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলি তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ককে সব জায়গায় ধরে রাখতে পারেনি। মানুষের একাংশ বিভাজনের রাজনীতির প্রভাবে ভোট দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও বিজেপির দাবি, এই জয় আসলে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত রাগের বহিঃপ্রকাশ।
সিউড়ি রামকৃষ্ণ শিল্প বিদ্যাপীঠে এদিন সিউড়ি, সাঁইথিয়া, ময়ূরেশ্বর ও দুবরাজপুর এই চার বিধানসভার গণনা চলে। সকাল থেকেই এই প্রতিটি কেন্দ্রে লিড নিতে শুরু করে বিজেপি। গণনাকেন্দ্রের বাইরে যখন গেরুয়া আবিরের দাপট আর ডিজে বক্সের গর্জন বাড়ছে, তখন তৃণমূলের শিবিরের কর্মীদের মুখ ম্লান হতে থাকে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, সিউড়িতে বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় প্রায় ৩৩হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। দুবরাজপুরে বিজেপির অনুপকুমার সাহা ২৭,৪৬৭ ভোটে এবং ময়ূরেশ্বরে অভিজ্ঞ নেতা দুধকুমার মণ্ডল ২১,০০২ ভোটে জয়ী হয়েছেন। বড় চমক দেখা গিয়েছে সাঁইথিয়ায়। যেখানে তৃণমূল প্রার্থী নীলাবতী সাহার হ্যাটট্রিক রুখে দিয়ে প্রায় ১০ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছেন বিজেপির প্রথমবারের প্রার্থী কৃষ্ণকান্ত সাহা।
তৃণমূলের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত রামপুরহাট মহকুমাতেও এবার গেরুয়া ঝড় আছড়ে পড়েছে। রামপুরহাট কেন্দ্রে প্রথম থেকেই এগিয়ে থাকা বিজেপি প্রার্থী ধ্রুব সাহা শেষ পর্যন্ত ২৩ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়লাভ করেন। তবে তৃণমূলের সম্মান রক্ষা করেছেন কাজল শেখ। হাসন কেন্দ্রে তিনি রেকর্ড ৩১ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন। নলহাটিতে রাজেন্দ্রপ্রসাদ সিং ১৩,৬০১ ভোটে এবং মুরারইতে মোশারফ হোসেন ৩৬হাজারের বেশি ব্যবধানে জিতলেও জেলার সামগ্রিক ফল তৃণমূলের কাছে একটি বড় ধাক্কা।
কাজল শেখ বলেন, বিজেপির এমন কোনও সাংগঠনিক শক্তি নেই যে তৃণমূলকে হারায়। তৃণমূলকে যদি কেউ হারায়, তবে তৃণমূলই হারায়। দলের ভিতর থেকে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। দুবরাজপুরের পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী নরেশচন্দ্র বাউড়িও এই পরাজয়ের দায় বোলপুরের নেতাদের দিকে ঠেলেছেন। দলে অন্তর্ঘাত হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
লাভপুরে বিদায়ী বিধায়ক অভিজিৎ সিংহকে পরাজিত করেছেন দেবাশিস ওঝা। তিনি ৩,৩০০ ভোটে জয়ী হতেই উল্লাসে ফেটে পড়েন বিজেপি কর্মীরা। বোলপুরে চন্দ্রনাথ সিংহ ১৩৬০৪ ভোটে জয়ী হলেও নানুরের ফলাফল নিয়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। বিধানচন্দ্র মাঝির ৮২৩৪ ভোটে জয়ের প্রতিবাদে বিজেপির বোলপুর সাংগঠনিক জেলার কর্মকর্তারা গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে ধর্নায় বসেন। সব মিলিয়ে বীরভূমের রাজনৈতিক মানচিত্র যে এবার বড় বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা এই ফলাফল থেকেই স্পষ্ট।