জদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন এবারও জয় সুনিশ্চিত। সেই মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলায় তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্কে ধস নামল। ফলস্বরূপ আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতেই পরাজয়। এমন নজিরবিহীন ভরাডুবিতে তৃণমূল নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। জানা গিয়েছে, শুধু হার নয়, একাধিক কেন্দ্রে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন হেভিওয়েট নেতারাও। তারপর থেকেই জেলাজুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কেন এমন ভরাডুবি?
গড়বেতা থেকে মেদিনীপুর, শালবনী থেকে নারায়ণগড়—একের পর এক কেন্দ্রে তৃণমূলের পরাজয়ের পিছনে স্পষ্ট ইঙ্গিত, সংগঠনে ঘুন ধরছিল ভিতরে ভিতরে। সেটা নেতারা ধরতেই পারেননি। উল্টে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জর্জরিত ছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন প্রবল আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী। তার জেরে মাটির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফল যা হওয়ার তাই। গড়বেতা বিধানসভায় তৃণমূল প্রার্থী উত্তরা সিংহ হাজরা ৩০ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত হন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির প্রদীপ লোধার কাছে। উত্তরা সিংহ হাজরা বলেন, ‘মানুষের রায় মেনে নিতেই হবে। অনেক মানুষ ভোট দিয়ে পাশে থেকেছেন। তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।’ শালবনীতেও একই ছবি। প্রাক্তন মন্ত্রী শ্রীকান্ত মাহাতকে নিয়ে তৃণমূল শিবিরে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। তিনি ১০ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, স্থানীয় স্তরে সংগঠনের দুর্বলতা এবং প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ—এই কেন্দ্রে জনমতের উপর প্রভাব ফেলেছে। তবে, সবচেয়ে তৃণমূলের বড় ধাক্কা এসেছে মেদিনীপুর বিধানসভায়। তৃণমূলের সাংগঠনিক জেলা সভাপতি তথা প্রার্থী সুজয় হাজরা একসময় উপনির্বাচনে প্রায় ৩৩ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। অথচ, এবারে তিনিই ৩৮ হাজার ৭৪৭ ভোটে পরাজিত। সুজয় হাজরা বলেন, ‘মানুষের রায় মাথা পেতে নিচ্ছি। গণতন্ত্রের উৎসবে মানুষের শেষ কথাই বলে।’ অন্তর্ঘাতের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, হেরে যাওয়ার পর এই বিষয়ে বলা ঠিক নয়।’ তৃণমূলের স্বস্তি খড়্গপুর গ্রামীণ বিধানসভা কেন্দ্র। সেখানে জয়ী হয়েছেন বর্ষীয়াণ নেতা দীনেন রায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের জনসংযোগ ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাই তাঁকে জয়ের রাস্তা দেখিয়েছে। অন্যদিকে, খড়্গপুর সদর কেন্দ্রে বিজেপির দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে প্রদীপ সরকারকে প্রার্থী করে চমক দিয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু সেই কৌশলও কাজে আসেনি। প্রদীপ সরকার প্রায় ২০ হাজার ভোটে পরাজিত হন। দাঁতন বিধানসভায় শুরুতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও শেষ পর্যন্ত বিজেপি প্রার্থী অজিত কুমার জানার কাছে ১০ হাজারের বেশি ভোটে হার মানেন তৃণমূলের মানিক মাইতি। কেশিয়াড়িতে রামজীবন মান্ডি এবং নারায়ণগড়ে প্রতিভা মাইতিও বিজেপি প্রার্থীদের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। এই ফলের পর তৃণমূলের অন্দরেই শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা। এক তৃণমূল নেতা চায়ের আড্ডায় আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘এমন রেজাল্ট হবে স্বপ্নেও ভাবিনি। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মানুষ পেয়েছে, উন্নয়ন হয়েছে—তবুও বিজেপিতে ভোট গেল।’