• বাংলায় গেরুয়া ঝড়
    বর্তমান | ০৫ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও নয়াদিল্লি: দিনটা ছিল ১৩ মে ২০১১। ৩৪ বছরের বাম অপশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর রায় দিয়েছিল বাংলা। মানুষের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল মা-মাটি-মানুষের সরকার। ১৫ বছরেই মমতার সরকারের প্রতি মোহভঙ্গ হল জনতার। চলতি বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড ৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। গোটা দেশের নজর ছিল সোমবার ফলাফলের দিকে। এদিন বেলা বাড়তেই স্পষ্ট হয়ে যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাংলায় অবশেষে সরকার গড়তে চলছে বিজেপি। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত পরিসংখ্যান যেখানে পৌঁছাল, তাকে শুধু একটি শব্দবন্ধেই ব্যাখ্যা করা চলে—গেরুয়া ঝড়। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, সর্বত্রই প্রায় ফুটল পদ্ম। এ যেন এক অদ্ভুত সমাপতন। দেড় দশক আগে ঠিক সিপিএমের ‘লালদুর্গ’ খানখান হওয়ার ঢঙে এদিন ছারখার হয়ে গেল জোড়াফুল শিবির। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সরকারের ৪৯ বছর পর বাংলায় আসছে ডবল ইঞ্জিন। রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রায় দু’ডজনের বেশি মন্ত্রী এদিন গোহারা হেরেছেন। আর সর্বত্র ইন্দ্রপতন। তার প্রথম নাম, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিকে ছিল তাই হতাশার অন্ধকার। অন্যদিকে, উচ্ছ্বাসের উজ্জ্বলতা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। এদিন সন্ধ্যায় দিল্লিতে তিনি বলেন, ‘বাংলায় নতুন সূর্যোদয় হয়েছে। এই সকালের জন্য বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মা এতদিনে শান্তি পেল। এটা ভেবেই ভালো লাগছে। অঙ্গ, কলিঙ্গের পর এবার বঙ্গজয় সম্ভব হয়েছে বাংলার মানুষের জন্যই।’ তবে ভোট-হিংসা নিয়ে তাঁর সতর্কবার্তা, ‘ভয় নয়, বরং ভবিষ্যতের কথাই বলব। কে কাকে ভোট দিয়েছে, কে কাকে ভোট দেয়নি—এসবের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। আগে নির্বাচনের সময় বিভিন্ন হিংসামূলক খবর আসত। এবার শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। ভয় নয়। আর হিংসা নয়। গণতন্ত্র জিতেছে।’ 

    ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে তিনি হেরেছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। পরবর্তীতে ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হন। এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে বিরোধী দলনেতা ফের মমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি এই কেন্দ্র থেকে লড়েছিলেন। নন্দীগ্রামে সহজেই জয় পেয়েছেন শুভেন্দু। কিন্তু তার পাশাপাশি নিজের ‘পাড়ায়’ ফের একবার শুভেন্দুর কাছেই হার স্বীকার করতে হল মমতাকে। অনিয়মের অভিযোগ তুললেন তিনি। নালিশ করলেন হেনস্তারও। কিন্তু রেকর্ড হল একটাই তথ্য, জয়ী শুভেন্দু অধিকারী। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনও রাজ্যের ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীকে পরপর দু’বার বিধানসভা ভোটে হারানোর বিরল নজির গড়লেন তিনি। গত পাঁচ বছরে বিরোধী দলনেতার পদে ভূমিকা ও বাংলায় বিজেপি সরকার গঠনে তাঁর অবদান পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কাঁথির অধিকারী পরিবারের এই সদস্যকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে। সূত্রের দাবি, বুধবার পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের পর রাজভবনে গিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানাবে বিজেপি। মোদি জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২৫ বৈশাখ বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ নেবে। সেই অনুষ্ঠানে হাজির থাকবেন তিনি নিজে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ ভিনরাজ্যের একঝাঁক মুখ্যমন্ত্রী।

    সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, সর্বভারতীয় বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলা দখল হল। মোদি-শাহের অধরা স্বপ্ন ছিল অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ জয়। সেই আদি-পুরানো মুখ শমীক ভট্টাচার্যের হাত ধরে বাংলায় গেরুয়া পার্টি শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চলেছে। রাজ্য বিজেপি সভাপতির মধ্যস্থতায় পার্টির মূলস্রোতে ফিরেছিলেন দিলীপ ঘোষ, রীতেশ তিওয়ারি। এদিন দলের প্রতীকে জয়ীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, স্বপন দাশগুপ্ত, তাপস রায়, অগ্নিমিত্রা পল, নীশিথ প্রমাণিক, শংকর ঘোষ, সজল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী প্রমুখ। আশাতীত সাফল্যের নেপথ্যে কে রয়েছেন? গেরুয়া শিবির সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব। বিধানসভা ভোটের কয়েকমাস আগে অমিত শাহ নিজে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি পর্যবেক্ষক করে পাঠান। পার্টির সাংগঠনিক জেলা ধরে ধরে তিনি বিধানসভাওয়াড়ি রণকৌশল স্থির করেছেন। পার্টির সব স্তরের কর্মী-নেতাদের থেকে নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ‘ইনপুট’। সেই মতো তৈরি হয়েছে স্ট্র্যাটেজি।

    বিজেপির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, একাধিক ইস্যুর সমর্থন এবার কেন্দ্রীয় শাসকদলের ঝুলিতে পড়েছে। প্রথমত, এসআইআরের জেরে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটের ৬ শতাংশ অবৈধ অংশ বাদ পড়েছে। চরম মেরুকরণের এই ভোটযুদ্ধে সর্বাধিক হিন্দু ভোট গিয়েছে বিজেপিতে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, রাজ্যের কয়েক কোটি বাম কর্মী-সমর্থক ইভিএমে রামের বোতাম টিপেছেন। উপরন্তু, এসআইআরের পর ভোটকেন্দ্রে যেতে অনীহা থাকা ভোটার ও নতুন ভোটাররা তৃণমূলের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। আর ৭৬টি কেন্দ্রে জোড়াফুল শিবির প্রার্থী বদল করেছিল। সূত্রের দাবি, টিকিট না পাওয়ার ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ বিদায়ী বিধায়করা কাজ করেছেন তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ফল, বিপুল জনাদেশ।
  • Link to this news (বর্তমান)