নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গেরুয়া টর্নেডোয় ‘তছনছ’ কলকাতা সহ লাগোয়া জেলায় অভেদ্য বলে পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেসের একের পর এক দুর্গ। পরিবর্তনের পক্ষে যে ‘প্রখর চোরাস্রোত’ বয়ে গিয়েছে রাজ্যজুড়ে, তা থেকে রেহাই পাননি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুর কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন বঙ্গ রাজনীতির এই হেভিওয়েট। শক্তগড় কলকাতায় ঘাসফুল ছেঁটে যেমন ‘পদ্ম’ ফুটিয়েছে গেরুয়া শিবির, তেমনই লাগোয়া উত্তর ও দক্ষিণ শহরতলি, হাওড়া ও হুগলি জেলায় গত ১৫ বছর ধরে চলে আসা তৃণমূল আধিপত্যকে ধূলিসাৎ করেছে।
মহানগরী কলকাতার মূল ১১টি আসনে এযাবতকাল দাঁত ফোটাতে না পারলেও, ভবানীপুর, রাসবিহারী, মানিকতলা, শ্যামপুকুর, কাশীপুর-বেলগাছিয়া ও জোড়াসাঁকোর মতো কেন্দ্র দখল করে রাজনীতির সব হিসেব-নিকেশ পাল্টে দিয়েছে পদ্মপার্টি। শুধু মূল শহরই নয়, বিদায়ী মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের খাসতালুক টালিগঞ্জ, যাদবপুর, বেহালা পশ্চিম ও বেহালা পূর্বের মতো ঘাসফুল বাগানে পদ্মচাষ করেছে বিজেপি। ছিনিয়ে নিয়েছে সোনারপুর উত্তর ও দক্ষিণ কেন্দ্রের মতো শহুরে আসনও। জোড়াফুলের শক্তঘাঁটি বলে কথিত দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রামীণ এলাকার সাগর, গোসাবা ও কাকদ্বীপ আসন তিনটিও দখল করেছে গেরুয়া শিবির। ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে গিয়েছে হাওড়া জেলায় তৃণমূলের আধিপত্য। কলকাতার যমজ এই শহরে হাওড়া উত্তর, শিবপুর ও বালির মতো কেন্দ্র তো বটেই, গ্রামীণ অংশে জগৎবল্লভপুর, আমতা, শ্যামপুর, উলুবেড়িয়া উত্তর এবং উদয়নারায়ণপুর আসনও নিজেদের ঝুলিতে ভরেছে বিজেপি। এই পর্বে তৃণমূলের সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা হুগলি জেলায়। শহর ও গ্রাম মিলিয়ে হুগলি জেলার যে ১৮টি আসন রয়েছে, তারমধ্যে ১৬টি আসনই আগামী পাঁচবছরের জন্য নিজেদের ‘হেপাজতে’ নিয়েছে পদ্মশিবির। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ৩৩টি আসনের মধ্যে গতবার বিজেপির দখলে ছিল মাত্র পাঁচটি আসন। এবার বনগাঁর মতুয়াগড়ের চারটি আসন ‘সুরক্ষিত’ করার সঙ্গেই আরও ২০টি আসন দখলে নিয়েছে পদ্মপার্টি।
কিন্তু কেন এই বিপর্যয়? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ বছরের শাসনপর্বে একের পর এক নির্বাচনে জয়ের পর মানুষের প্রতি যতটা ‘নমনীয়’ হওয়ার দরকার ছিল তৃণমূলের, তুলনায় ততটাই ‘ঔদ্ধত্য’ দেখিয়েছে তারা। সঙ্গে লাগামছাড়া দুর্নীতি। সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পই হোক কিংবা বাড়ি, ফ্ল্যাট কেনাই হোক, সবক্ষেত্রে ‘কাটমানি’ আর ‘তোলাবাজি’র দাপটে বীতশ্রদ্ধ আর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল আমজনতা। এরই পাশাপাশি আর জি কর কাণ্ড, স্কুল ও পুরসভার নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি, জমি কেলেঙ্কারি, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ২৬ হাজার চাকরি খোয়ার মতো ঘটনা এমনকি যুবভারতীর মেসিকাণ্ডও শহরের নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে বিস্তর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যে বিশাল বিশাল ব্যবধানে কলকাতা সহ আশপাশের এলাকায় বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সহকর্মীরা পরাজিত হয়েছেন, সেটাকে জনমানসে ‘পুঞ্জীভূত’ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন সবাই। আর সে কারণেই বিদায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য সুজিত বসু ৩৭ হাজারের বেশি ভোটে আসন খুইয়েছেন স্বল্প পরিচিত বিজেপি প্রার্থীর কাছে। কীর্তন শিল্পী অদিতি মুন্সি, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, ইন্দ্রনীল সেনের মতো হেভিওয়েটরা যে ব্যবধানে হেরেছেন, তাও গত ১৫ বছরের ভোট রাজনীতিতে বিরল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ভিত্তিক মহিলা ভোটারদের যে ব্যাংক গত পাঁচ বছরে তৃণমূলকে টানা ‘সুদ’ দিয়ে গিয়েছে, এবার তাতেও বড়োসড়ো ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্ণহিন্দু বা দলিত হিন্দু তো বটেই সংখ্যালঘু মহিলারাও আকর্ষিত হয়েছেন বিজেপির তিনহাজার ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের’ আশ্বাসে। সবমিলিয়ে ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’ ক্যাচ লাইনে ভরসা দেখিয়ে হেভিওয়েটদের বিদায় সুনিশ্চিত করেছে বাংলার আমজনতা।