বিজেপি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গেরুয়া পতাকা ওড়ালেও জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ সাফল্য পায়নি বলে অটলবিহারী বাজপেয়ীর ভারী দুঃখ ছিল।
বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের এত দিনের অধরা স্বপ্ন পূরণ করতে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ দু’জনেই রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে। নিজেদের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক কৌশলকে বাজি ধরে। বিজেপি হেরে গেলে ঘরে-বাইরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা এবং ভোটের ময়দানে তাঁর ‘ম্যাজিক’ নিয়ে প্রশ্ন উঠত। মোদীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে অমিত শাহের দাবিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত।
দক্ষিণ ভারত বাদ দিলে বিজেপির কাছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা বাংলায় জয় ছিনিয়ে ‘বিজেপির চাণক্য’ অমিত শাহ তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের কার্যকারিতার ফের প্রমাণ দিলেন। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের দাবি, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের ফল নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা ও তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা অটুট থাকার প্রমাণ।’’
পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচটি বিধানসভা নির্বাচনের ফলে বিরোধী শিবিরের তিন গুরুত্বপূর্ণ শরিক ধরাশায়ী হল। তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে এবং সিপিএম তথা বাম। এই তিন শক্তি শুধু বিজেপির রাজনৈতিক বিরোধিতা করেনি। তৃণমূল, ডিএমকে ‘আঞ্চলিকতাবাদ’-এর রাজনীতিকে সামনে রেখে বিজেপির ‘জাতীয়তাবাদ’-এর রাজনীতিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। সিপিএম তথা বাম বিজেপির বিরুদ্ধে মতাদর্শগত লড়াই চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কেও পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল, তামিলনাড়ুর ডিএমকে ও কেরলের বাম সরকার কেন্দ্রের মোদী সরকারের নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সোমবার তিন বিজেপি-বিরোধী সরকারেরই পতন হল। বিশেষত কেরলে বাম সরকারের পতনের ফলে ১৯৭৭ সালের পরে এই প্রথম আর কোনও রাজ্যে বামেরা ক্ষমতায় রইল না। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এর উল্লেখ করে বলেছেন, ‘‘এটা রাজনৈতিক বদল নয়, ভাবনার বদল।’’
আঞ্চলিক দলগুলি হীনবল হয়ে পড়লে কি বিরোধী শিবিরে কংগ্রেসের লাভ?এত দিন আঞ্চলিক দলগুলি দাবি করেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে কংগ্রেসের তুলনায় তাদের সাফল্য বেশি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল জিতলে বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বের রাশ রাহুল গান্ধীর বদলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেওয়া হোক বলে নতুন করে দাবি উঠত। কিন্তু তৃণমূল, ডিএমকে, বাম গদিচ্যুত হলেও কেরলে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। দশ বছরের বাম সরকারের পতনের সুবাদে। যদিও অসমে বিজেপির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে কংগ্রেস গোহারা হেরেছে। শরদ পওয়ার, উদ্ধব ঠাকরে, তেজস্বী যাদবের মতো আঞ্চলিক দলের প্রধানেরা ইতিমধ্যেই বিজেপির সঙ্গে লড়াইয়ে হার মেনেছেন। এ বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্তিক্ষয়ের পরে আগামী বছর উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোটে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির সামনে কঠিন লড়াই। অখিলেশ বিধানসভা নির্বাচনে গত লোকসভা ভোটের সাফল্য ধরে রাখতে পারবেন? না হলে আরও এক আঞ্চলিক দল ধরাশায়ী হবে।
পাঁচ বিধানসভার ফল প্রকাশের পরে রাহুল গান্ধী সোমবার বিকেলে ফোনে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তামিলনাড়ুর নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসা টিভিকে প্রধান বিজয়ের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন তিনি। যদিও রাহুল নিজে ভোটের ফলের দিনে মাসকাটে ছুটি কাটাচ্ছিলেন বলে একটি সূত্রের দাবি। রাহুল গান্ধী দাবি করেন, একমাত্র কংগ্রেসই বিজেপির মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কংগ্রেসের যা হাল, তাতে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিরই সুবিধে হয়ে যাবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।
সোমবার চার রাজ্য ও এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ফল বলছে, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে সরকারের পতন হলেও কে সরকার গড়বে তা স্পষ্ট নয়। কেরলে কংগ্রেস জেতায় গোটা দেশে চারটি রাজ্যে দল ক্ষমতায় এল। অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়, অসমে বিজেপি সরকার ও পুদুচেরিতে এনডিএ সরকারের প্রত্যাবর্তনের ফলে দেশের মোট ২২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে গেরুয়া পতাকা উড়ছে। ঝাড়খণ্ড বাদ দিলে অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ নিয়ে পূর্ব ভারত ও মিজ়োরাম বাদে গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত বিজেপি দখল করে ফেলল।