• এ কলকাতা রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতের: জাভেদ আখতার
    এই সময় | ০৫ মে ২০২৬
  • কলকাতায় আয়োজিত হলো ৩৩তম ‘পি.সি. চন্দ্র পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠান। রবিবার, ৩ মে, সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে সেই পুরস্কার তুলে দেওয়া হলো জাভেদ আখতারের হাতে। বিগত ৩২ বছর ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রের স্বনামধন্যদের সম্মান জানিয়ে আসছে এই গ্রুপ। মূলত দুটো লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এই সম্মাননা প্রদানের ভাবনা। এক, বিভিন্ন ক্ষেত্রের সেরা কৃতিত্বের দাবিদারদের সম্মানজ্ঞাপন। দুই, এই শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা পূর্ণ চন্দ্র চন্দ্রের চিন্তাধারা, তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যে পুরস্কার আগে পেয়েছেন আশা ভোঁসলে, কপিল দেব, উস্তাদ আমজাদ আলি খান, গ্র্যান্ডমাস্টার বিশ্বনাথন আনন্দের মতো গুণীজনরা। সেই তালিকায় নবতম নাম জাভেদ আখতার। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শিল্পসৃষ্টিতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান।

    চলচ্চিত্রজগতে জাভেদের যাত্রা শুরু হয় সত্তরের দশকে, চিত্রনাট্যকার হিসেবে। সেলিম খানের সঙ্গে জুটি বাঁধেন। তৈরি হয় ‘সেলিম-জাভেদ’ জুটি। বলিউডের ইতিহাসে যা কিংবদন্তি। এই জুটির হাত ধরেই তৈরি হয়েছে ‘জ়ঞ্জির’, ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’র মতো একাধিক কালজয়ী ছবি। এই ছবিগুলি বাণিজ্যিক ভাবে সফল হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় সিনেমার ভাষা ও চরিত্র নির্মাণে নয়া দিশা দেখিয়েছে। সম্মানিত হওয়ার পর মঞ্চ থেকেই দর্শক এবং কলকাতাকে ভালোবাসা জানান ‘সিলসিলা’ ‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’, ‘বীর জ়ারা’ ‘স্বদেশ’-এর মতো ছবির গীতিকার জাভেদ।

    বলিউড তাঁর কলমের কাছে চিরঋণী। বলিউডে প্রেমের ভাষা যদি কারও কলমে সবথেকে সহজ, স্বচ্ছ আর গভীর হয়ে থাকে, তাঁর নাম নিঃসন্দেহে জাভেদ আখতার। তাঁর লেখা রোম্যান্টিক গানগুলো কখনও নিশ্চুপ ভালোবাসার কথা বলে, কখনও আবার জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও ভালোবাসার আলো খুঁজে দেয়। ভালোবাসার কথা বলে যাঁর কলম, স্রষ্টা তা হলে কতটা রোম্যান্টিক? এমন প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসেন জাভেদ। উত্তরে তিনি বলেন, ‘এক সাক্ষাৎকারে শাবানাকেও (আজ়মি) এই একই প্রশ্ন করা হয়েছিল। শাবানা বলেছিল, জাভেদের মতো আন-রোম্যান্টিক মানুষ আর হয় না। আমি সত্যিই এমনই মানুষ। লেখার সময়ে আমার উপর প্রেমদেবতা ভর করে হয়তো। তবে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে তাঁরা আমার সৃষ্টিকে ভালোবেসেছেন, মনে রেখেছেন।’

    সাহিত্যিক হিসেবেও জাভেদের কৃতিত্ব অনন্য। বিশেষ করে উর্দু কবিতার জগতে তাঁর অবদান অসামান্য। তাঁর কবিতা, গজ়ল ও প্রবন্ধে ফুটে ওঠে সমাজ, প্রেম, মানবতা ও সময়ের নানা দিক। তাঁর কবিতায় প্রেম আছে, কিন্তু তা নিছক ব্যক্তিগত আবেগে আটকে থাকে না। তার সঙ্গে জুড়ে থাকে সময়, রাজনীতি, মানবিকতা এবং যুক্তিবোধ। তিনি প্রগতিশীল চিন্তার ধারায় বিশ্বাসী। তাঁর লেখায় বারবার উঠে আসে স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতার কথা। রাজনীতি আর শিল্প কি কখনও আলাদা হতে পারে না? এ দিন জবাবে জাভেদ বলেন, ‘পারবে না কেন। তবে শিল্প নির্মাণে বাড়তি কেরামতি দেখাতে হবে। শিল্পকে শিল্পের মতো করে ভাবতে হবে। রাজনীতিকে রাজনীতির মতো করে। পরস্পরবিরোধী ভাবলে মুশকিল।’

    বিভিন্ন সাহিত্য উৎসব, কবিতা পাঠের আসর, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বহুবার কলকাতায় এসেছেন জাভেদ। প্রতিবারই তিনি কলকাতার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন। এ শহরের আন্তরিকতা, শিল্পের মাধুর্য, সাহিত্যের গভীরতায় তাঁর মুগ্ধতার কথা আরও একবার প্রকাশ করলেন তিনি। লেখক আরও জানালেন, কলকাতার বহুভাষিক ও বহু-সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর বিশেষ পছন্দের। পাশাপাশি কলকাতায় এসে তিনি সত্যজিৎ রায়কে নিয়েও কথা বলেন। বললেন, ‘সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা বিশ্বমানের। ভারতীয় চলচ্চিত্রকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।’ তবে তিনি চান না, কলকাতা কোনও রাজনীতির ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে থাক। তাঁর কথায়, ‘এ কলকাতা রবীন্দ্রনাথের, সত্যজিতের। সংস্কৃতি এ শহরের অন্যতম রসদ। অন্য কিছু নয়।’
  • Link to this news (এই সময়)