প্রদীপ চক্রবর্তী শ্রীরামপুর
শ্রীরামপুর কলেজের গণনাকেন্দ্র থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সামনে তৃণমূলের ক্যাম্পে সকাল থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেছিলেন দলের কর্মী–সমর্থকরা। জয় নিশ্চিত ভেবেই তাঁদের অনেকেই সঙ্গে করে এনেছিলেন দলীয় পতাকা এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাটআউট। ক্যাম্পে অনেকে ভিড় করবেন, এটা ধরে নিয়েই খাবারের এলাহি আয়োজন করা হয়েছিল। সকালে ছিল চা, বিস্কুট, কেক। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার জন্য চিকেন বিরিয়ানির অর্ডার দেওয়া ছিল। ব্রেকফাস্টের জন্য আনা হয়েছিল ছোলা–মুড়ি। ভোটগণনা শুরু হওয়ার আগেই কেউ কেউ ছোলা–মুড়ি চিবোতে শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু গেরুয়া ঝড়ের আভাস মিলতেই মুড়ির ঠোঙা ফেলে একে একে পালাতে শুরু করেন তৃণমূল কর্মীরা। বেলা ১২টা বাজতে না বাজতেই তৃণমূলের ক্যাম্প কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়। ক্যাম্পের একপাশে পড়েই রইল খাবার। তারপরেও শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীরামপুর পুরসভার পুরপ্রধান গিরিধারী শাহরা গুটিকয়েক কর্মী–সমর্থককে নিয়ে ধৈর্য ধরে বসেছিলেন। তাঁদেরকে দেখেই শুরু হয় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান। তা দেখে ভয় পেয়ে যান তৃণমূল নেতা–কর্মীরা। যাঁরা কল্যাণের সঙ্গে ছিলেন তাঁরাও ভোকাট্টা হয়ে যান।
ভোট গণনার শুরুতে প্রথম দিকে বিজেপি প্রার্থীরা অল্প ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। তা দেখে তৃণমূলকর্মীরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলেন, ‘এখন সবে পোস্টাল ব্যালট গোনা হচ্ছে। সরকারি কর্মীরা আমাদের ভোট দেননি। তাই বিজেপি এগিয়ে আছে।’ কিন্তু ইভিএম মেশিন খোলার পর থেকেই জেলার ১৮টি আসনেই বিজেপির বিজয়রথ এগোতেই তৃণমূল কর্মীদের মুখটা ফ্যাকাশে হতে শুরু করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাউন্ড থেকে বিজেপি প্রার্থীরা দ্রুত গতিতে জয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। তখনই শুকনো মুখ করে গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন তৃণমূলের কর্মী–সমর্থকরা। তাঁদের চোখেমুখে ফুটে উঠছিল হতাশার ছাপ। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, গণনাকেন্দ্রে হাজির হওয়া তৃণমূল কর্মীদের কাছে ফোন না থাকায়, রাজ্যের বাকি আসনের কী হালচাল, তখনও পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারছিলেন না তৃণমূলের কর্মীরা। বিকেলের দিকে বলাগড়, সপ্তগ্রাম, চুঁচুড়া, চন্দননগর, পাণ্ডুয়ায় বিজেপির প্রার্থীরা তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যেতেই, গণনাকেন্দ্র থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে, বাড়ির দিকে হাঁটা দেন তৃণমূলের এজেন্টরাও।
এরই মধ্যে শ্রীরামপুর কলেজে এসে হাজির হন উত্তরপাড়া কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তী। সেই সময়ে তিনি সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী ও তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্যের থেকে শুধু এগিয়ে থাকাই নয়, নিজের জয় রার্যত নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন। জীবনে প্রথমবার ভোটে দাঁড়িয়ে জয়ের আনন্দে তিনি তখন আত্মহারা। গণনাকেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই জনাদেশ আমরা মাথা পেতে নিয়েছি। যে বিশ্বাস উত্তরপাড়াবাসী আমাদের উপরে রেখেছেন, তার মর্যাদা রাখব। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহর নেতৃত্ব ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ আমাদের ব্রত। আমরা সে ভাবেই রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে শ্রীরামপুর কলেজের ছোট গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন চাঁপদানির তৃণমূল প্রার্থী তথা শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল সভাপতি অরিন্দম গুঁই। তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষের জন্য কাজ করেছি। আমরা যে পরিমাণ ভোট পাওয়ার আশা করেছিলাম, সেই লক্ষ্য আমরা পূরণ করতে পারিনি। সেই কারণেই এই বিপর্যয়।’
শ্রীরামপুর কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী নবনীতা চক্রবর্তী বললেন, ‘আমরা লড়াইয়ে ছিলাম। ভোট শতাংশের হিসেব পাইনি। সেটা জেনে বলব।’