• কোচবিহার, মালদায় কমলো আসন, গেরুয়া গড়ে ৪ জেলায় শূন্য তৃণমূল
    এই সময় | ০৫ মে ২০২৬
  • এই সময়: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন, কয়েকটি জেলায় খাতা খুলতে পারবে না তৃণমূল। সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়ে গেল। উত্তরবঙ্গে চার জেলা দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়িতে কোনও আসন পায়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল।

    জলপাইগুড়ি: লোকসভার মতো বিধানসভা ভোটেও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে উত্তরবঙ্গের প্রচার শুরু করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নববর্ষের দিন মিছিলও করেন। কিন্তু তাতেও তৃণমূলের ভরাডুবি ঠেকানো গেল না। গত বিধানসভায় তৃণমূল জেলার সাতটি আসনের মধ্যে চারটি আসনে জয়ী হলেও এ বার খালি হাতে ফিরতে হয়েছে জোড়াফুলকে। বাংলাদেশ সীমান্ত ছুঁয়ে ভুটান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত জলপাইগুড়ি জেলায় আদিবাসী, রাজবংশী, নেপালি, সাঁওতালি ও মেচ সম্প্রদায়ের বাস। মিশ্র সংস্কৃতির মানুষের কাছে কোনও আশার আলো দেখাতে না পারায় এই পরিজন বলে মনে করেন বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামী। তাঁর সংযোজন, 'তৃণমূলের কাঠ-বালি-পাথর চুরিতে তিতিবিরক্ত মানুষ আমাদের সমর্থন করেছেন। বিজেপির নীতি ও আদর্শের কাছে ওরা পরাজিত হয়েছে।'

    জলপাইগুড়ি সদরে তৃণমূল যাঁকে প্রার্থী করেছিল সেই কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে ২০১৮-র পঞ্চায়েত ভোটে বুথ দখল, ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ থাকায় মানুষ ভালো চোখে নেননি। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়িতে শিলিগুড়ির ডাকাবুকো নেতা রঞ্জন শীলশমাকে তৃণমূল প্রার্থী করলেও শালুগাড়া থেকে শক্তিগড় পর্যন্ত নেপালি ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের বিরাট ভোট রঞ্জনের দিকে যায়নি। ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, নাগরাকাটা আসনে নদী থেকে বালি-পাথর চুরির অভিযোগ বারে বারে উঠে এলেও শাসকদলের নেতারা চোখ বুজে থেকেছেন বলে অভিযোগ। সেই কারণেই দলের জেলা যুব সভাপতি রামমোহন রায় দাঁড়ালেও ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন। জীবনে কোনও দিন না-হারা বুলু চিকবরাইক মালবাজার কেন্দ্রে চা-বলয়ের সমর্থন আর পাননি। জেলা তৃণমূলের সভানেত্রী মহুয়া গোপ বলেন, 'খারাপ ফলের জন্য জলপাইগুড়ি জেলার আলাদা কোনও কারণ হবে, এটা মনে করি না। কেন জেলার মানুষের সমর্থন পেলাম না সামগ্রিকভাবেই পর্যালোচনা করতে হবে।'

    আলিপুরদুয়ার: পাঁচ বছর আগে আলিপুরদুয়ার জেলার পাঁচটি বিধানসভাতেই জিতেছিল বিজেপি। এ বারও একুশের ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটল আলিপুরদুয়ারে পাঁচে পাঁচ। সঙ্গে রাজ্যেও ফুটল পদ্মফুল। গতবারের তুলনায় জয়ের ব্যবধান অনেকটাই বাড়িয়েছেন বিজেপি প্রার্থীরা। কেন এমন ফল? বিজেপির ব্যাখ্যা, জেলায় 'এক্স-ফ্যাক্টর' পরিযায়ী শ্রমিকরা এ বার ঢেলে ভোট দিয়েছেন। এ ছাড়া চা-শ্রমিকরাও বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছেন।

    দলের রাজ্য সহ-সভাপতি দীপক বর্মনের ব্যাখ্যা, 'পরিযায়ী শ্রমিকরা রাজ্যে স্থায়ী কাজ পাওয়ার আশায় আমাদের দু'হাত ভরে ভোট দিয়েছেন। তাঁদের সংখ্যাটা দেড় লক্ষেরও বেশি। চা-শ্রমিকরাও দিনের পর দিন বঞ্চিত হতে হতে তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়েছেন।'

    জেলায় 'হোয়াইটওয়াশ' হওয়ার পরে কার্যত স্যারেন্ডার করেছে তৃণমূল। দলের জেলা চেয়ারম্যান গঙ্গাপ্রসাদ শর্মার বক্তব্য, 'আলিপুরদুয়ারে অনেক উন্নয়ন করেছে রাজ্য সরকার। অথচ বিজেপির কিছু প্রতিশ্রুতির কাছে আমরা হার মানতে বাধ্য হয়েছি। যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-এর পাল্টা বিজেপির অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার-এ তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মোকাবিলা করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। বন্ধ ও রুগ্ন চা-বাগানের সমস্যা সম্পূর্ণ মেটানো সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে বিজেপি যে ভাবে প্রচার চালিয়েছে, আমরা তার মোকাবিলা করতে পারিনি। সব মিলিয়ে বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের দ্বিমুখী আক্রমণেই আমরা হেরে গিয়েছি।'

    দার্জিলিং ও কালিম্পং: পাহাড় হোক বা সমতল, শিকে ছিড়ল না তৃণমূলের। কেন এ রকম ফল হলো? বিশ্লেষণ করবেন তৃণমূল নেতৃত্ব। তবে পাহাড়ের অনেক নেতা শাসকদলের প্রতি ক্ষোভের কারণ বলতে গিয়ে ন'বছর আগের কথা তুলে ধরেছেন। পৃথক রাজ্যের দাবিতে তখন উত্তাল পাহাড়। ২০১৭-র সেই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করেছিল রাজ্য সরকার। সেই থেকেই পাহাড়ের মানুষের মধ্যে তৃণমূলের প্রতি বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হয়। ক্ষোভ আরও বাড়ে জিটিএ-কে জিইয়ে রেখে পাহাড়ে স্বশাসন প্রক্রিয়া দমিয়ে রাখার অভিযোগ। ২০২৬-এর ভোটে সেই ক্ষোভের জ্বালা মেটাল পাহাড়। তিনটি আসনই এ বার বিজেপির দখলে গিয়েছে।

    দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় ২০২১-ছ'টি আসনের মধ্যে সমতলের তিনটি আসন পায় বিজেপি। পাহাড়ের তিনটি আসনের মধ্যে দু'টি যায় বিজেপি-র দখলে। কালিম্পং কংগ্রেসের পায় তৃণমূল জোট সঙ্গী প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা। এ বার কালিম্পং ও বিজেপির দখল করেছে। এ দিন দুই পাহাড়ি জেলায় দলের ব্যাপক জয়ের পরে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্ত বলেন, 'তৃণমূল পাহাড়ের মানুষকে ঠকিয়েছে। তার সঙ্গে ভ্রষ্টাচারে জড়িয়ে গিয়েছে। তারই ফলে মানুষ এ দিন জবাব দিয়েছে।' তবে জিটিএ সভাসদ বিনয় তামাং স্পষ্ট করে বলেছেন, 'পাহাড়ের মানুষকে কোণঠাসা করে রাখার জবাব এ বার তৃণমূল পেয়ে গিয়েছে। আমাদের কোনও সমস্যারই কোনও সুরাহা হয়নি।' জিটিএ-র অন্যতম পরামর্শদাতা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার নেতা শক্তিপ্রসাদ শর্মা বলেন, 'আমরা আলোচনায় বসব। তবে একটা বিজেপি হাওয়া এ বার হয়তো ছিল। না-হলে গোটা রাজ্য জুড়ে এমন ফল কেন হবে?'

    তৃণমূল এ বার সমতলের তিনটি আসন পুনর্দখলের জন্য ঝাঁপিয়েছিল। শিলিগুড়িতে প্রার্থী করা হয় উত্তরবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম মুখ তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেবকে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর ঘোষই এ দিন শিলিগুড়িতে জয়ী হন। তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিরেওয়াল অবশ্য দাবি করেছেন, 'বিজেপি জয়ী হয়ে নানা কথা বলতেই পারে। তবে মমতা বন্দোপাধ্যায় রাজ্যে জুড়ে উন্নয়ন করেছে। বিজেপি-র এ বার একটা হাওয়া ছিল। না-হলে গোটা রাজ্য জুড়ে আমাদের এমন ফল হতো না।' গৌতম দেব বলেন, 'অনেক কিছুই ঘটেছে গণনাকেন্দ্রে। আরও খতিয়ে দেখে মন্তব্য করব।'

    কোচবিহার: কোচবিহার জেলায় নয়টি আসনের মধ্য আটটিতেই পরাজিত হয়েছে তৃণমূল। একমাত্র সিতাই বিধানসভা কেন্দ্রে সঙ্গীতা রায় জয়ী হয়ে দলের মুখরক্ষা করেছেন। হারের জন্য দু'টি অন্যতম কারণ উঠে এসেছে। একটি দলের চরম গোষ্ঠী কোন্দল। অন্যটি, প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষের জেরে জেলায় একাধিক সিনিয়র নেতার বসে যাওয়া। অথচ ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিককে হারাতে দলের সব গোষ্ঠীর নেতারা এক হয়ে লড়াই করেছিলেন। শিলিগুড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পরে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, উদয়ন গুহ, অভিজিৎ দে ভৌমিক-সহ অন্যরা এক হয়ে মাঠে নামেন। লোকসভা ভোটে তৃণমূল জয়ী হওয়ার পরে ব্যাপক ধস নামে বিজেপির সংগঠনে। তাদের দখলে থাকা একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতে দখল করে নেয় তৃণমূল। কিন্তু এ বার বিধানসভা নির্বাচনে সেই একতা চোখে পড়েনি। বরং রবীন্দ্রনাথ, বিনয়কৃষ্ণ বর্মন, গিরীন্দ্রনাথ বর্মন, হিতেন বর্মনদের টিকিট না-দিয়ে মাথাভাঙা কেন্দ্রে সাবলু বর্মন, নাটাবাড়ি কেন্দ্রে শৈলেন বর্মা, তুফানগঞ্জ কেন্দ্রে ক্রিকেটার শিবশংকর পাল এবং শীতলখুচি কেন্দ্রে হরিহর দাসকে টিকিট দেওয়া হয়। কোচবিহার জেলার চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন বলেন, 'প্রার্থী নিয়ে সকলের মনে অসন্তোষ ছিল এটা সত্যি। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেই জানতাম না কে, কোথায় প্রার্থী হচ্ছেন।'

    মালদা: পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোটের 'মূল্য' হাড়ে হাড়ে টের পেল তৃণমূল, বিজেপি ও কংগ্রেস। হরিশ্চন্দ্রপুর, সুজাপুর, গাজোল, চাঁচল, ইংরেজবাজার, মোথাবাড়ি, হবিবপুর, মানিকচক, রতুয়া বিধানসভা থেকে বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা অংশ কাজের সূত্রে ভিন রাজ্যে থাকেন। এ বার নির্বাচনের আগে তাঁরা কেরালা, তামিলনাড়ু, দিল্লি ও মহারাষ্ট্র থেকে বাড়ি ফেরেন শুধুমাত্র ভোট দিতে। মালদা জেলা তৃণমূল সভাপতি আব্দুর রহিম বক্সী বলেন, 'খোঁজ নিয়ে জেনেছি, লক্ষাধিক পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট আমাদের হিসেব উলটপালট করে দিয়েছে। তাঁরাই ফ্যাক্টর হয়েছেন।' বিজেপির আসন চার থেকে বেড়ে এ বার ছয় হয়েছে। দলের দক্ষিণ মালদার সাংগঠনিক সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, 'অন্তত দশটি আসনে জেতার টার্গেট ছিল। রতুয়া, চাঁচল, মোথাবাড়ি ও মালতীপুর বিধানসভায় তৃণমূলে সঙ্গে জোর লড়াই হয়েছে। এ সব কেন্দ্রে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বিপুল সংখ্যক ভোট রয়েছে। কিন্তু তাঁরা বিরূপ হলেন কেন, সেটা বিশ্লেষণ করতে হবে।'

    তথ্য: সঞ্জয় চক্রবর্তী, মিঠুন ভট্টাচার্য, দিব্যেন্দু সিনহা, বাসুদেব ভট্টাচার্য, সব্যসাচী ঘোষ, পিনাকী চক্রবর্তী চাঁদকুমার বড়াল, কৌশিক দে

  • Link to this news (এই সময়)