• ভবানীপুরে শুভেন্দুর কাছে কেন হারলেন মমতা?
    আজকাল | ০৫ মে ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভবানীপুর মানেই মমতা, ভবানীপুর মানেই তৃণমূলের দুর্গ। কিন্তু, এই ভোটে সেই প্রবাদ ছাড়খার। ভবানীপুরেও ফুটল পদ্ম। এই আসনে বড় ব্যাবধানে মমতাকে ব্যানার্জিকে হারিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।  

    মমতা ব্যানার্জি কেন ভবানীপুরে পরাজিত হলেন, ছ'টি কারণ নীচে তুলে ধরা হল:

    ১. সরকার-বিরোধী হাওয়া: যখন কোনও সরকারকে তীব্র সরকার-বিরোধী হাওয়ার মুখোমুখি হতে হয়, তখন তথাকথিত 'নিরাপদ আসনগুলোও' আর নিরাপদ থাকে না। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য একটি 'নিরাপদ আসন' হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্র থেকেই মমতা ব্যানার্জি উপনির্বাচনে লড়েছিলেন। সেসময় 'দিদি'-র জন্য জায়গা করে দিতে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী শোভনদেব চ্যাটার্জিকে এই আসন থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

    ২. শুভেন্দু অধিকারী ফ্যাক্টর: বাংলার বিজেপি হয়তো মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য কোনও নির্দিষ্ট মুখ ঘোষণা করেনি, কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শুভেন্দু অধিকারীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মমতার নিজের গড়েই তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। শুভেন্দু এর আগেই নন্দীগ্রামে তৃণণূল সুপ্রিমোকে পরাজিত করেছিলেন। সেই ঘটনাই বিজেপির অনুকূলে একটি আবহ তৈরি করে দেয়, যদি কেউ মমতাকে পরাজিত করতে পারেন, তবে তা একমাত্র শুভেন্দু অধিকারীই।

    ৩. ভোটের হার কমা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা: ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জির ভোটের হার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, ২০২১ সালের ৭২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে তা ৪২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তাঁর ভোটারদের সমর্থন বিজেপির দিকে সরে গিয়েছে। বিধানসভা কেন্দ্রের স্ট্রং-রুম এবং রাস্তার ধারের প্রচারণায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে, বিজেপি ভবানীপুরের 'মাঠের লড়াইয়ে'  অপেক্ষাকৃত ভাল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল, অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জি তখন বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর দলের প্রার্থীদের হয়ে প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। ভবানীপুর কেন্দ্রের আওতাধীন মোট আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী পাঁচটি ওয়ার্ডেই বিজেপি এগিয়ে ছিল। তারা তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ে ভালো ফলাফল করেছিল এবং সেই অগ্রগামিতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। 

    ৪. বিজেপির সুনির্দিষ্ট প্রচার কৌশল: বিজেপি এই নির্বাচনকে (তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি) 'ভয়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন' হিসেবে তুলে ধরেছিল এবং মনে হচ্ছে তাদের সেই বার্তা বেশ কার্যকর হয়েছে। প্রচারের ধারায় এক বড়সড় পরিবর্তন এনে বিজেপি মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণ চালায়নি, বরং তাঁরা বাংলার জন্য বিকল্প প্রস্তাবনা এবং তাদের নিজস্ব রূপকল্প তুলে ধরেছিল। অন্যদিকে, ভোটাররা প্রকাশ্যে 'পরিবর্তন'-এর প্রয়োজনীয়তা, দুর্নীতি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সৃষ্ট 'হুমকির সংস্কৃতি' নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের নিম্নস্তরের নেতাকর্মীরা দলের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করায় দলটির বিরুদ্ধে জনরোষ ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

    ৫. 'এসআইআর' ফ্যাক্টর: ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করতে এবং তালিকা থেকে 'ভুয়ো ভোটারদের' বাদ দিতে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। এর ফলে ভোট-জালিয়াতি ও ভোটারদের প্রভাবিত করার সেই অপতৎপরতা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে, যা অতীতে বাংলার প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকারকে, সে বামফ্রন্টই হোক বা তৃণমূল কংগ্রেস, নির্বাচনে সুবিধা পাইয়ে দিত। তবে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তৃণমূল কংগ্রেস যে অভিযোগ তুলেছিল, তা এই নির্বাচনী লড়াইকে আরও তীব্র ও হাড্ডাহাড্ডি করে তোলে।

    ৬. আরজি কর ঘটনার প্রভাব: আরজি কর মামলার ঘটনার পর বাংলায় অনুষ্ঠিত এটিই প্রথম নির্বাচন। বিজেপি অত্যন্ত কৌশলগতভাবে নির্যাতিতার তরুণীর মা রত্না দেবনাথকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। এর ফলে কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে সংঘটিত সেই নৃশংস অপরাধের ঘটনাটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। সম্ভবত এই বিষয়টি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিপক্ষেও কাজ করেছে, কারণ চিকিৎসকরা নিজেদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কলকাতায় ধর্মঘটে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
  • Link to this news (আজকাল)