বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’। অধিকাংশ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেই এই প্রবাদ সত্য হলেও, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের ক্ষেত্রে এটা একেবারেই খাটে না। তাঁদের মূল মন্ত্র ‘কর্তব্য আগে, নিজের জীবন পরে’। এটা যে শুধু কথার কথা নয়, কয়েক বছর আগে অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ে তারই প্রমাণ দিয়েছিলেন মেজর মুস্তাফা বোহরা।
প্রতিরক্ষা ইতিহাসে কিছু কিছু নাম অমর হয়ে থাকে তাঁদের অসীম সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের জন্য। মেজর মুস্তাফা বোহরা সেই রকমই এক নাম। রাজস্থানের উদয়পুরের মানুষ মুস্তাফা ছিলেন ভারতীয় সেনার এভিয়েশন কোরের এক বীর যোদ্ধা। তিনি ছিলেন অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার (ALH-WSI) ‘রুদ্র’-র সুদক্ষ কো-পাইলট। ২০২২ সালের ২১ অক্টোবর অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এক ভয়াবহ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তিনি শহিদ হয়েছিলেন। কী ঘটেছিল সে দিন?
ওই দিন সকালে অরুণাচল প্রদেশের লিকাবালি থেকে একটি নজরদারি অভিযানে বেরিয়েছিলেন মেজর মুস্তাফা ও তাঁর সহকর্মীরা। পাইলট ছিলেন মেজর বিকাশ ভাম্বু। ভারত-চিন সীমান্তের একেবারে কাছে, মিগিং এলাকায় ওড়ার সময়ে হঠাৎই এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হেলিকপ্টারটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে সেই আগুন।
জ্বলতে থাকা কপ্টারটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে মাটির দিকেও নেমে আসছিল। মেজর বোহরা এবং মেজর বিকাশ ভাম্বুর সামনে সুযোগ ছিল নিকটবর্তী কোনও জায়গায় অবতরণ করার। কিন্তু তাঁরা দেখেছিলেন নীচে রয়েছে ঘন জনবসতি। তার উপরে একটি বড় Ammunition Depot অর্থাৎ, সামরিক গোলাবারুদের ডিপোও ছিল। সেখানে জ্বলন্ত হেলিকপ্টারটি পড়লে সেই ডিপোয় আগুন ধরে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা আছে। এতে হয়তো তাঁদের প্রাণ বাঁচবে, কিন্তু বহু সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে।
এর পরেই নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাঁরা জ্বলন্ত কপ্টারটিকে লোকালয় থেকে দূরে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং একটি জনশূন্য পাহাড়ি এলাকায় ক্র্যাশ ল্যান্ড করান। তাঁদের এই অসীম সাহসিকতায় রক্ষা পেয়েছিল কয়েকশো অসামরিক প্রাণ। কিন্তু, দেশ হারিয়েছিল তার পাঁচ বীর সন্তানকে। যাঁদের অন্যতম ছিলেন মেজর মুস্তাফা বোহরা। সেই সময়ে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে এই আত্মত্যাগ, এই পরিণত বুদ্ধি, ভাবা যায়? এই দুঃসংবাদ যখন তাঁর বাড়িতে এসে পৌঁছেছিল, সেই সময়ে মেজর মুস্তাফার বিয়ের প্রস্তুতি ছিল প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু শোকের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর পরিবার তাঁদের ছেলের আত্মবলিদানকে কুর্নিশ জানিয়েছিল।
মেজর বোহরার এই অসামান্য সাহসিকতাকে সম্মান জানিয়ে ২০২৪ সালের ৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর বাবা-মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মরণোত্তর ‘শৌর্য চক্র’। উদয়পুরের খেরোদা গ্রামের এই ভূমিপুত্র আজ গোটা ভারতের গর্ব। তাঁর মা ফাতিমা বোহরার কথায়, ‘সৈনিকদের মৃত্যু হয় না, তাঁরা বেঁচে থাকেন দেশবাসীর হৃদয়ে।’