• মৃত্যুর পরেও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে অভিযুক্ত ডাক্তারের উত্তরাধিকারীকে, রায় সুপ্রিম কোর্টের
    এই সময় | ০৬ মে ২০২৬
  • এই সময়: মৃত চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও কি চালানো যাবে চিকিৎসায় গাফিলতির পুরোনো মামলা? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে রেখে গত ফেব্রুয়ারি শুনানি শুরু হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। তাতে সোমবার দেশের শীর্ষ আদালত এক বেনজির রায়ে জানাল, চিকিৎসায় গাফিলতিতে অভিযুক্ত চিকিৎসক মামলা চলাকালীন মারা গেলেও ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চলবে মামলা। এমনকী, মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে, সংশ্লিষ্ট মামলার রায় অনুযায়ী, মৃত চিকিৎসকের উপার্জিত সম্পত্তির মধ্যে থেকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেন তাঁর উত্তরাধিকারীও।

    শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, ক্রেতাসুরক্ষা আইনের আওতায়, চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্ত চিকিৎসকের মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রী, সন্তান বা অন্য আইনি উত্তরাধিকারীদের পক্ষ করা যেতে পারে। তবে তাঁদের দায় সীমাবদ্ধ থাকবে মৃত চিকিৎসকের রেখে যাওয়া সম্পত্তির আর্থিক পরিমাণ পর্যন্ত।

    সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জেকে মহেশ্বরী ও অতুল এস চন্দুরকরের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, চিকিৎসায় গাফিলতির ফলে আর্থিক ক্ষতির দাবি ‘ব্যক্তিগত কারণ’ হিসেবে মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। বরং ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার ভিত্তিতে সেই দাবি টিকে থাকে এবং মৃত চিকিৎসকের সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট মামলাটি শুরু হয় এক রোগীর পরিবারের তরফে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ এনে দায়ের করা ক্রেতাসুরক্ষা মামলার মাধ্যমে।

    প্রথমে জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করে মামলার শুনানি শুরু করে এবং ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। তবে পরে রাজ্য ক্রেতাসুরক্ষা কমিশন সেই রায় বাতিল করে দেয়। ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে অভিযোগকারী বিষয়টি আপিলের মাধ্যমে জাতীয় ক্রেতাসুরক্ষা আদালতে নিয়ে যান। মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন অভিযুক্ত চিকিৎসকের মৃত্যু হয়। তার পরেই অভিযোগকারীর তরফে এ নিয়ে মামলা করা হয় সুপ্রিম কোর্টে। অভিযুক্ত চিকিৎসকের উত্তরাধিকারীদের তরফে আপত্তি উঠলেও তা শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি শীর্ষ আদালতে। সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়ে দেয়, চিকিৎসায় গাফিলতির মামলা অভিযুক্ত চিকিৎসকের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় না।

    আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে চিকিৎসায় গাফিলতি সংক্রান্ত মামলায় বড় প্রভাব ফেলবে এবং ক্রেতাসুরক্ষা অধিকারকে নতুন দিশা দেখাবে। রোগীস্বার্থে কাজ করা সংগঠন ‘পিপলস ফর বেটার ট্রিটমেন্ট’–এর সভাপতি, অনাবাসী চিকিৎসক কুণাল সাহা এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘১৯৯৮–তে আমার স্ত্রী অনুরাধা সাহার মৃত্যুর মামলায় বিচার পেতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ১৫ বছর, যার মধ্যে অন্তত একজন ডাক্তারের মৃত্যু হয়েছিল বিচার শেষের আগেই। অভিযুক্ত ডাক্তারের মৃত্যু হলেও তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীকে ভুল চিকিৎসায় মৃতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভবিষ্যতে সুবিচারের পথ প্রশস্ত করবে ভারতের অগুনতি অসহায় ভুক্তভোগী পরিবারকে।’

    যদিও এই রায়ে চিন্তিত চিকিৎসক সংগঠন ওয়েস্টবেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী। তিনি বলেন, ‘গভীর উদ্বেগের বিষয়। এমন রায় চিকিৎসকদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করবে, ‘ডিফেন্সিভ মেডিসিন’-এর প্রবণতা বাড়াবে এবং চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে তুলবে।’ অনেকটা একই সুর চিকিৎসক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়। তিনি বলেন, ‘আদালত আইন মেনেই রায় দিয়েছে। কিন্তু আমাদের আপত্তিটা হলো, চিকিৎসা যেহেতু পণ্য নয় ও রোগী যেহেতু ক্রেতা নয়, তা হলে চিকিৎসাকে কেন ক্রেতাসুরক্ষা হিসেবে দেখা হবে।’

  • Link to this news (এই সময়)