• অরূপের হার, স্বরূপে ‘বিশ্বাস’ হারাল কি টলিপাড়া? কোথায় স্বস্তি, কোথায় চাপা দুশ্চিন্তা?
    আনন্দবাজার | ০৬ মে ২০২৬
  • এ পাড়াতেও পালাবদল চাই। এ আবার বলতে হবে? টলিপাড়ায় প্রশ্ন পড়লেই নানা কোণ থেকে একই উত্তর। রাজনৈতিক পালাবদলের পথ ধরে এ বার বদল আসুক ফেডারেশনের নেতৃত্বেও।

    টালিগঞ্জ কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অরূপ বিশ্বাসের ভাই, ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের কথা ছাড়া একটি কুর্সিও এ দিক-ও দিক হয় না বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। এমনই রেওয়াজ ছিল। অন্তত সে কথাই টলিপাড়ার বাতাসে উড়ত। তবে ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর বিদায়ের দিন গুনছিল অনেকেই। এ বার রাজ্য নির্বাচনের ফলে পালাবদলের ঘোষণা হতেই বিশ্বাস ভাইদের বিদায় যে স্বস্তি আনতে পারে, তা নিয়ে অকপট বহু অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক।

    পরিচালক সুদেষ্ণা রায়। ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় গত দেড় বছরেরও বেশি সময় কাজ নেই তাঁর। বদল এলে খুশি হবেন? আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রশ্ন ছিল তাঁকে। সুদেষ্ণা বললেন, “সবটাই সময়ের উপরে ছেড়ে দিচ্ছি।” তার পরেই তাঁর সাফ জবাব, “ব্যক্তিগত মতামত জানাতে গিয়ে গত দেড় বছর ধরে কাজ নেই। তাই এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করব না। তা হলে হয়তো সারা জীবনের মতো কাজ হারাতে হবে।” সুদেষ্ণা তাই নীরবে সব দেখতে চান বদলের পরে কী ঘটে।

    শোনা যায়, ফেডারেশনের কোপে পড়েই কাজ ছিল না পরিচালক-অভিনেতা অয়ন সেনগুপ্তের। বাধ্য হয়ে রাস্তায় খাবারের দোকান দিতে হয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক পালাবদলে তিনি কতটা খুশি? প্রশ্ন রাখতেই তিনি জানান, অন্যায় বেশি দিন স্থায়ী হয় না। ভোটের ফলাফল তার প্রমাণ। যাঁর প্রভাবে কাজ হারিয়েছিলেন, সেই ফেডারেশন সভাপতি যদি দায়িত্বে আর না থাকেন, তা হলে? অয়নের কথায়, “সেটা সময় বলবে। সংগঠনের নির্বাচন সেই সিদ্ধান্ত নেবে। তার থেকেও বড় কথা, সব ক‘টি গিল্ডের সদস্যরা এই বিষয়ে মতামত জানাবেন। তবেই কোনও পদক্ষেপ করা সম্ভব।” তবে অয়ন চান, ইন্ডাস্ট্রির কাজ জানা কেউ এই পদে আসুন। ভালবেসে, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করুন। সবাই যেন কাজ পান। “আগের মতো দম ফেলার ফুরসত যেন না পাই আমরা”, চাহিদা তাঁর।

    আর কিছু দিন অপেক্ষা করলে হয়তো প্রকাশ্যে ‘ক্ষমা’ চাইতে হত না তাঁকে। ফেডারেশন সভাপতির বিরুদ্ধাচারণ করায় ‘শাস্তি’ পেতে হয়েছিল তাঁকে। ছোটপর্দার পরিচালক সৃজিত রায় কি আর একটু ধৈর্য ধরলে ভাল করতেন? আপাতত সৃজিতের পরিচালনায় ‘পরিণীতা’ ধারাবাহিক যথেষ্ট জনপ্রিয়। তাঁর কথায়, “তখন পরিস্থিতি অন্য ছিল। আমার ক্ষমা চাওয়ার উপরে অনেকে নির্ভর করে ছিলেন। অনেকের অন্ন-সংস্থান আটকে ছিল। তাই বৃহত্ত স্বার্থে যদি ক্ষমা চাইতেই হয়, তাতে কোনও আক্ষেপ নেই।” তবে ইন্ডাস্ট্রি রাজনীতিমুক্ত হোক, এটা মন থেকে চাইছেন। সৃজিত বললেন, “ইন্ডাস্ট্রির এমন কেউ এই দায়িত্ব নিন, যিনি কাজের মর্ম বোঝেন। মন থেকে সকলের মঙ্গল চান। তবেই ইন্ডাস্ট্রির মঙ্গল।”

    অভিনেত্রী পায়েল সরকার কারও নাম নিতে চান না। কিন্তু টলিউড থেকে ‘ব্যান’ সংস্কৃতি উঠে যাক, মন থেকে চাইছেন। তিনি বিজেপি-তে যোগ দিয়েছিলেন বেশ কিছু বছর আগে। ইন্ডাস্ট্রির সংগঠনের সভাপতি কি তা হলে ‘রাজনৈতিক’ কেউ হওয়াই ভাল? পায়েলের কথায়, “যিনি ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝবেন, ইন্ডাস্ট্রির মানুষগুলোকে বুঝবেন, এমন কাউকে চাইছি। তিনি প্রচুর কাজ নিয়ে আসবেন, এমন স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি, সংগঠনের শীর্ষে বসে থাকা মানুষটির হাত ধরে সবাই কাজ পাবেন। কাউকে বসে থাকতে হবে না। বাংলা বিনোদনদুনিয়া আবার তার হারানো কৌলিন্য ফিরে পাবে।” প্রায় একই কথা অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্রেরও। তিনি সদ্য বিজেপি ছেড়ে শাসকদলে যোগ দিয়েছিলেন। রূপাঞ্জনা বলেছেন, “নন্দনে আবার যাতে সবাই শো পান, সেটা চাই। কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকুক। নির্দিষ্ট সময়ে পারিশ্রমিক পান শিল্পী এবং কলাকুশলীরা। প্রযোজক তাঁর লগ্নির টাকা ফেরত পান আগের মতো। আর ব্যবসায়িক স্বার্থে রিমেক ছবি তৈরি হোক আবার, আপাতত এগুলো পেলেই খুশি।” তাঁর মতে, আইন জানা লোকেদের যোগ্য পদে বসানো উচিত।

    এত দিন ফেডারেশনের নিয়মের ধাক্কায় নাকি নাভিশ্বাস দশা ছিল প্রযোজকদের। রাজনৈতিক পালাবদল যদি ফেডারেশনেও বদল আনে, ‘গুপি শুটিং’ বন্ধ হবে? জবাবে সোচ্চার তিন প্রযোজক অশোক ধনুকা, রানা সরকার, পীযূষ সাহা। তিন জনেই একবাক্যে সায় দিয়ে জানাচ্ছেন, এত দিন অরূপ এবং স্বরূপের দাপটে, তাঁদের নিয়মকানুনের ধাক্কায় কাজ ছবি বানানো দায় হয়ে উঠেছিল। অথচ আমরা বাংলা বিনোদনদুনিয়ার স্বার্থেই লগ্নি করি।” তাঁদের মতে, অবিলম্বে ফেডারেশন সভাপতির পদে বদল কাম্য। কাকে এই পদে দেখতে চান তাঁরা? পায়েল বা সৃজিতের মতোই অশোক ধনুকাও ইন্ডাস্ট্রির কাউকে এই পদে দেখতে চাইছেন। যিনি প্রযোজকদের সমস্যা বুঝবেন। শিল্পীদের প্রতি সমব্যথী হবেন। কাজ বুঝবেন। রানার অবশ্য এ বিষয়ে বাছবিচার নেই। তিনি বলেছেন, “রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক, যিনিই আসুন না কেন, তিনি যেন ইন্ডাস্ট্রিকে বোঝেন। আমাদের কাজ জানা লোক চাই।”

    শুধুই অভিনেতা বা কলাকুশলী, প্রযোজকেরা নয়, এই বদল চাইছে ইন্ডাস্ট্রির অধিকাংশ গিল্ড। ম্যানেজার গিল্ড এবং ভেন্ডার গিল্ডের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তাঁদের কথায়, “বদল চাই। এ আবার বলতে হবে? অবশ্যই বদল চাইছি। চাইছি, কাজের লোক আসুন। এই বদল শীঘ্রই আসছে।”

    যাঁর উপস্থিতি নিয়ে এত আলোচনা, নানা মহলের এত মত, তিনি কী বলছেন? স্বরূপ আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেছেন, “পরিস্থিতি পুরোটাই নির্ভর করছে গিল্ডের সদস্যদের উপরে, যা আলোচনাসাপেক্ষ। টেকনিশিয়ানরা যা চাইছেন, সেটা জানাবেন।” বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা চলছে ফেডারেশন এবং সমস্ত গিল্ডের প্রতিনিধি সদস্যদের। শীঘ্রই বৈঠকে বসবেন সকলে। স্বরূপ এ-ও জানান, ফেডারেশন বরাবর কলাকুশলীদের পক্ষে। তার জন্য অনেক কটূক্তি শুনেছেন তিনি। আগামী দিনে কী ভাবে কাজকর্ম চলবে, সেটাই দেখার অপেক্ষায় ফেডারেশন সভাপতি। তাঁর কথায়, “বরাবর কলাকুশলীদের নিয়ে কাজ করার কথা বলেছি। তার জন্য অনেকের হয়তো আমার কথা খারাপ লেগেছে।” নতুন ফেডারেশন গঠিত হলে সংগঠন কি ‘গুপি শুটিং’ বন্ধ করতে পারবে? ২০ বছরের সভাপতির দাবি, “কেউ যদি কলাকুশলী কম নিয়ে বা না নিয়ে কাজ করতে চান, তখন বিষয়টি দেখা যাবে।”
  • Link to this news (আনন্দবাজার)