এই সময়, খড়্গপুর: মুখ বদলেও রক্ষা হলো না গড়! উল্টে সেই সব জায়গায় বিপুল ব্যবধানে হারতে হলো তৃণমূল প্রার্থীদের!
ভোটের ফল ঘোষণা হওয়ার পর থেকে প্রশ্ন উঠছে— তা হলে কি এ বারের নির্বাচনে প্রার্থী একেবারেই গৌণ বিষয় ছিল? সাধারণ মানুষের ‘পাল্স’ বুঝতেও ব্যর্থ হয়েছেন তৃণমূলের জেলা ও রাজ্য নেতৃত্ব? ‘আইপ্যাক’ই বা তা হলে কী করল? তৃণমূল নেতাদের কাছে কোনও প্রশ্নেরই সদুত্তর নেই। তবে বিজেপির দাবি, মানুষ দীর্ঘ ১৫ বছর সময় দিয়েছিল তৃণমূলকে। কিন্তু তারা মুখে উন্নয়নের কথা বললেও কাজে কিছু করে দেখাতে পারেনি। তাই জনাদেশ গিয়েছে বিজেপির দিকেই।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ১৫টি আসনের মধ্যে ৭টি আসনে প্রার্থী বদল করেছিল তৃণমূল। তার মধ্যে আবার ৬টি জেতা আসনে বিদায়ী বিধায়কদের প্রার্থী করেনি। প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ আসনে প্রার্থী বদল করেও নিট ফল শূন্য। মুখ বদলের পরে এক জন প্রার্থীও জিততে পারেননি। উল্টে ১০ থেকে ৩৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন সকলেই। প্রার্থী করা নিয়ে তৃণমূল–সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তার নির্যাস এই যে, যাঁরা মানুষের জন্য কাজ করবেন, যাঁদের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ তাঁদেরই প্রার্থী করা হবে। এ ছাড়াও এক জনকেই বারবার প্রার্থী করা হবে আর অন্যরা সুযোগ পাবেন না তেমনটাও হতে পারে না। যে কারণে দাঁতনের বিদায়ী বিধায়ক বিক্রমচন্দ্র প্রধান, নারায়ণগড়ের সূর্যকান্ত অট্ট, কেশিয়াড়ির পরেশ মুর্মু, ডেবরার হুমায়ুন কবীর থেকে শুরু করে দাসপুরের মমতা ভুঁইয়া, চন্দ্রকোণার অরূপ ধাড়াকে এ বার দল প্রার্থী করেনি।
ডেবরার বিদায়ী বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে মুর্শিদাবাদের ডোমকলে পাঠিয়ে ডেবরায় আনা হয় রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই রাজীবও এ বার বিজেপির শুভাশিস ওমের কাছে হারলেন ২৮ হাজার ৮০১ ভোটে! নতুন মুখ মানিক মাইতি, প্রতিভা মাইতি, রামজীবন মান্ডি, আশিস হুদাইত থেকে শ্যামলী সর্দার, সূর্যকান্ত দোলইদেরও হারতে হল বিপুল ভোটে। চন্দ্রকোণায় সূর্যকান্ত দোলই তো ৩৩ হাজার ৪৮১ ভোটে হেরেছেন বিজেপির সুকান্ত দোলইয়ের কাছে! ভোটের ফল ঘোষণার পরে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে দলের অন্দরে। যা থেকে উঠে আসছে একাধিক তথ্য।
তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের একাংশ জানাচ্ছেন, বেশ কয়েক বছর ধরে সংগঠন ছিল নামেই। কারও কোনও কাজ ছিল না। কখনও জেলা চালাতেন জেলার পুলিশ সুপার, আর ব্লকের সংগঠন চলত থানার ওসি-আইসিদের কথায়। গ্রামের কোনও মানুষ সমস্যায় পড়ে দলের নেতার কাছে এলে তাঁরা থানার ওসি-দের ফোন করার সাহসও দেখাতেন না। যে নেতার সঙ্গে জেলা পুলিশ সুপার বা ওসি-আইসিদের ঘনিষ্ঠতা ছিল, কেবল তাঁরাই ক্ষমতা ধরতেন। ফলে যত দিন গিয়েছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেড়েছে। সাধারণ মানুষের কাছেও মোটেই ভালো বার্তা যায়নি। সেই সঙ্গে আইপ্যাকও যথেচ্ছ খবরদারি করেছে।
ওই প্রবীণ নেতাদের কথায়, ‘এ ভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কটাই ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য নির্বাচন করা, বুথে ছাপ্পা মারা, হারের পরেও একাধিক পুরসভা ও পঞ্চায়েত সমিতির দখল নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তারও প্রভাব পড়েছে জনমানসে।’ এ বার নির্বাচন কমিশনের কড়া পদক্ষেপে মানুষ নিজের মতো ভোট দিতে পেরেছেন। তাতেই ভিতরের ঘুণধরা চেহারাটা বেরিয়ে এসেছে বলে দলীয় নেতৃত্বও আড়ালে স্বীকার করে নিচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি তৃণমূল নেতারা। এই পরিস্থিতি যে তাঁরাও আঁচ করতে পারেননি তা কবুল করছেন দলের দুই জেলা সভাপতি অজিত মাইতি ও সুজয় হাজরা। তবে, এ ব্যাপারে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘১৫ বছরে তৃণমূল কোনও উন্নয়ন করতে পারেনি। উল্টে দুর্নীতিতে ভরে গিয়েছিল পুরো দলটা। মানুষ তাই বিজেপিকে বেছে নিয়েছে।’