নির্বাচনী প্রচারে প্রবীণ সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য দাবি করেছিলেন, রামের শিবিরে চলে যাওয়া এবার বাম শিবিরে ফিরে আসবে। একই সুরে কর্মী সমর্থকদের সতর্ক করেছিলেন দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও। বাম নেতৃত্বের এমন দাবি এবং সতর্কতা শুনে বেশ পুলকিত ছিলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। কারণ, শিলিগুড়ি আসনে বাম ভোট বিজেপিতে চলে যাওয়া তৃণমূলের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ভোট গণনার সময় ইভিএম মেশিন খুলতে দেখা যায় উল্টো ছবি! একদিকে বামেরা যেমন নিজেদের ভোট ঘরে ফেরাতে পারেনি। অন্যদিকে তৃণমূলও নিজেদের ভোট ধরে রাখতে পারেনি। সিপিএম এবং তৃণমূল দুই শিবিরেই থাবা বসিয়ে সুনামি ডেকেছে গেরুয়া শিবির। এবার সিপিএমের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৯ হাজার ১৬৮। শতাংশের হিসেবে ৪.৯৯ শতাংশ। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে ২৮ হাজার ৮৩৫ ভোট পেয়েছিল সিপিএম। শতাংশের হিসেবে সেটা ছিল ১৬.০৩ শতাংশ। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট ছিল ৭৮ হাজার ৫৪। শতাংশের হিসেবে ৪৬.৩৬ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে ২০১৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সিপিএমের ভোট কমেছে ৪১.৯৯ শতাংশ। এরমধ্যে ২০২১ থেকে ২০২৬ দুটো বিধানসভা নির্বাচনের ব্যবধানে শিলিগুড়ি আসনে বাম ভোট কমেছে ১১.৩১ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে বামেদের মতো তৃণমূল শিবিরেও ভূমিক্ষয় অব্যাহত ছিল। এবার নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছে ৪৭ হাজার ৫৬৮ ভোট। শতাংশের হিসেবে ২১.৯১ শতাংশ। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫৩ হাজার ৭৮৪ ভোট। শতাংশের হিসেবে ৩০.০৫ শতাংশ। এর আগে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৬৩ হাজার ৯৮২ ভোট। শতাংশের হিসেবে ৩৮.০১ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে ২০১৬ থেকে ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে শিলিগুড়ি আসনে তৃণমূলের ভোট কমেছে ১২.০১ শতাংশ। তার মধ্যে ২০২১ থেকে ২০২৬ দুটো বিধানসভা নির্বাচনের ব্যবধানে ভোট কমেছে ৪.৫৯ শতাংশ।
প্রশ্ন উঠেছে, বামেদের মতো তৃণমূলের জনপ্রিয়তায় ভাটার টান কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ১৯৫১ সালে গঠিত শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রটি শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৩৩টি ওয়ার্ডের ১ থেকে ৩০ এবং ৪৫ থেকে ৪৭ দার্জিলিং জেলা বাকি ওয়ার্ডগুলি জলপাইগুড়ি জেলার অংশ নিয়ে গঠিত। পুরোপুরি শহরাঞ্চলভিত্তিক আসন এটি। এখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেশি। এরা খুব কাছে থেকে পরখ করেছে তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের ঔদ্ধত্য। বিরোধীদের গুরুত্ব, সম্মান না-দেওয়া। চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা। বেড়ে চলা বৈভব। প্রভু সুলভ মনোভাব, দলীয় সমর্থক ও নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে চাকরবাকরের মতো ব্যবহার। ক্ষমতার দম্ভ, দাদাগিরি। প্রোমোটার, তোলাবাজদের প্রশ্রয়। শহরে পরিষেবার বেহাল দশা। চুরি, ছিনতাই, নেশার কারবার, শ্লীলতাহানির ঘটনা বেড়ে চলা। সাধারণ মানুষ বিরক্ত হলেও ভয়ে মুখ খোলেনি। কিন্তু চোরা স্রোতের মতো তৃণমূলের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়ে সিস্টেমের পরিবর্তনের আশায় বিজেপি-র দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু বামেরা কেন রামে চলে যাওয়া তাদের ভোট ঘরে ফেরাতে এবারও ব্যার্থ হলেন?
ওই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাম ক্ষমতায় ফিরবে না। ওই ভাবনা থেকেই তৃণমূলকে ঠেকাতে বাম সমর্থকদের বড় অংশ রাজ্যে পরিবর্তন চেয়ে পদ্ম প্রতীকে ভোট তুলে দিয়েছেন। বাম ও তৃণমূল ছেড়ে আসা ভোটে শিলিগুড়ি বিধানসভা আসনে বিজেপি ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। সেটা বাম ও তৃণমূল নেতৃত্ব মোটেও আন্দাজ করতে পারেননি জন্যই এবারের ফলাফল দেখে বিস্মিত হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে ২০১৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে গেরুয়া শিবিরের ভোট বেড়েছে ৫৪.৩২ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২১ এবং ২০২৬ শেষ দুটো বিধানসভা নির্বাচনে ভোট বেড়েছে ১৫.৭২ শতাংশ। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৫০.০৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবার সেটা বেড়ে হয়েছে ৬৫.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে শিলিগুড়িতে বিজেপি শুধু তাদের ভোট ধরে রাখেনি। বাম ও তৃণমূলের ঘরে সিধ কেটে জয়ের ব্যবধান বাড়িয়েছে।