• ‘নিখোঁজ’ পুলিশকর্তা শান্তনুর নেতৃত্বাধীন কমিটিও নজরে! সব সদস্যকে চাকরির দায়িত্ব পালন করতে হবে! নির্দেশ নবান্নের
    আনন্দবাজার | ০৭ মে ২০২৬
  • পুলিশের সুযোগ-সুবিধা দেখে যে কমিটি, তার সদস্যদের এ বার সরকারি চাকরির দায়িত্বটিও পালন করতে হবে। শুধু কমিটির কাজ করলে চলবে না। এই মর্মে বুধবার সরকারি নির্দেশ জারি হয়েছে। প্রসঙ্গত, ওই কমিটির সর্বেসর্বা (কো-অর্ডিনেটর) শান্তনু সিংহ বিশ্বাস। যাঁর বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিস জারি করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বার বার তলব করা হলেও হাজিরা না দেওয়ায় শান্তনুর বিরুদ্ধে ওই নোটিস জারি করা হয়।

    খাতায়কলমে শান্তনু হলেন পুলিশের ডিডব্লিউজিআর (ডেভেলপমেন্ট, ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড গ্রিভান্স রিড্রেসাল) কমিটির সমন্বয়ক। ওই কমিটির সঙ্গে জড়িতেরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন ‘ক্ষমতা’ উপভোগ করেন। কলকাতা পুলিশে এই তথ্য কারওরই অজানা নয় যে, তাঁরা পুলিশের কাজ-টাজ বিশেষ করেন না। উপরন্তু পুলিশের জন্য নির্দিষ্ট গাড়ি ‘ব্যক্তিগত’ কাজের জন্য ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ আছে বাহিনীর অন্দরে। তবে শান্তনুর প্রতাপ এতটাই দোর্দণ্ড যে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সে বিষয়ে কোনও আপত্তি করার অধিকার ছিল না। রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পরে সেই ‘পট’ পরিবর্তন হয়েছে। শান্তনু নিজেও ইডির তলব থেকে বাঁচতে ‘নিখোঁজ’।

    বুধবার রাজ্য পুলিশের ডিআইজি (পরিকল্পনা এবং কল্যাণ) একটি নির্দেশিকা জারি করেছেন। তাতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ডিডব্লিউজিআর-এ নিযুক্ত সদস্যেরা সরকারি দায়িত্ব ‘যথাযথ’ পালন করছেন না। ওই বিষয়ে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে নির্দেশিকায়। ওই সদস্যদের যথাসম্ভব শীঘ্র নিয়মিত সরকারি কাজে বহাল করতে বলা হয়েছে। পুলিশ সূত্রের খবর, নির্দেশিকায় এক প্রকার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, শুধু ‘কমিটির কাজ’ করলে চলবে না। পুলিশে চাকরির দায়িত্বও পালন করতে হবে।

    ওই কমিটি পুলিশের ‘সুযোগ-সুবিধা’ দেখার কাজ করে। বাহিনীর অন্দরে কমিটির ‘প্রভাব’ সর্বজনবিদিত। ঘটনাচক্রে, আরজি কর হাসপাতালের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত সঞ্জয় রায় কলকাতা পুলিশের ওয়েলফেয়ার কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যথেষ্ট ‘প্রভাবশালী’ও ছিলেন।

    মঙ্গলবারই ‘নিখোঁজ’ পুলিশকর্তা শান্তনুর বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিস জারি করেছে ইডি। দু’টি মামলার তদন্তের সূত্রে তাঁকে একাধিক বার তলব করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি। কিন্তু কোনও বারই তিনি সশরীরে হাজিরা দেননি। এই পরিস্থিতিতে তিনি দেশ ছাড়তে পারেন, এমন আশঙ্কা করে শান্তনুর নামে লুকআউট নোটিস জারি করে ইডি। রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের দিন, গত ২৮ এপ্রিল কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনুকে সিজিও কমপ্লেক্সে তলব করেছিল ইডি। কেন্দ্রীয় সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছিল, বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুর সঙ্গে সম্পর্কিত মামলার সূত্রে তাঁকে তলব করা হয়েছিল।

    দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জের বাসিন্দা সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে জমিদখল, তোলাবাজি-সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। অস্ত্র আইনেও মামলা রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এমন বেশ কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করে ইডি। ওই মামলায় বেহালার ব্যবসায়ী জয় কামদারকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা। ওই মামলার সূত্র ধরেই গত মাসে ফার্ন রোডে শান্তনুর বাড়িতে হানা দিয়েছিল ইডি। ভোর থেকে শুরু হয়েছিল অভিযান। শেষে রাত ২টো নাগাদ শান্তনুর বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা। ওই অভিযান চলাকালীন শান্তনুকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তল্লাশির পরের দিনই সোনা পাপ্পু সংক্রান্ত মামলায় শান্তনু এবং তাঁর দুই পুত্র সায়ন্তন এবং মণীশকে সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে পাঠিয়েছিল ইডি। সে দিন তাঁদের কাউকে ইডির দফতরে যেতে দেখা যায়নি।

    গত এপ্রিলে কালীঘাট থানার প্রাক্তন ওসি শান্তনুকে বালি পাচার মামলার তদন্তেও তলব করেছিল ইডি। তবে তিনি যাননি। পরিবর্তে শান্তনুর আইনজীবী যান ইডির দফতরে। সূত্রের খবর, অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে শান্তনু সময় চেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাছে। স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আস্থাভাজন’ হওয়ার সুবাদে শান্তনু এক ধরনের ‘ক্ষমতা’ ভোগ করতেন। বাহিনীর পদস্থ এবং উচ্চপদস্থ অফিসারেরাও তাঁকে সমঝে চলতেন। তবে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পরে শান্তনুর ‘প্রতাপ’ যে আর আগের মতো থাকবে না, তা বলাই বাহুল্য। ফলে কালক্ষেপ না করে নির্দেশিকা জারি করেছে নবান্ন। ওই নির্দেশিকার পাশাপাশি কমিটির সদস্যদের পুলিশের গাড়ি ব্যবহারের উপরেও মৌখিক ভাবে ‘নজর’ রাখার নির্দেশ গিয়েছে।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)