শুধু গঙ্গাজল ছিটিয়েই ক্ষান্ত নন তাঁরা! পিয়া সেনগুপ্ত যত ক্ষণ না ইমপার সভাপতিপদ থেকে পদত্যাগ করছেন, তত ক্ষণ সম্পূর্ণ ‘শুদ্ধিকরণ’ ঘটছে না। বুধবার দিনভর চাপানউতরের পর এমনই দাবি বিরোধীপক্ষের প্রযোজকদের। তাঁদের তরফ থেকে পরিবেশক, হলমালিক শতদীপ সাহা জানিয়েছেন, শুক্রবার বৈঠক বসবে দু’পক্ষের। পিয়ার পদত্যাগেই অনড় তাঁরা।
সোমবার ভোটের ফলপ্রকাশের পর থেকেই ইমপা-য় উপস্থিত বিরোধীপক্ষের প্রযোজকেরা। তাঁদের দাবি, পদত্যাগ করতে হবে পিয়াকে। রাজনীতিমুক্ত হতে হবে সংগঠনকে। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সামনেও এই দাবি তোলেন তাঁরা। জরুরি নির্বাচন দাবি করে বদল চান সংগঠনের সদস্যদেরও। ওই দিন পিয়া জানান, বুধবার কার্যনির্বাহী সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী, এ দিন সদস্যদের নিয়ে বৈঠক হয়। এ দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পিয়ার অভিনেতাপুত্র বনি সেনগুপ্ত। বৈঠকশেষে পিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়, বিরোধীপক্ষের অভিযোগ, অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে, বহিরাগতদের নিয়ে ভোট করিয়েছিলেন সংগঠনের সভাপতি। তাই তাঁকে কেউ মানতে রাজি নন। এ প্রসঙ্গে তাঁর কী বক্তব্য? পিয়া বলেন, “কলকাতা হাই কোর্টের অবজার্ভেশনে ইমপা-র নির্বাচন হয়েছিল। প্রচুর সদস্য সে দিন ভোট দিতে এসেছিলেন। আমাদের কাছে তার ফুটেজ রয়েছে।” তিনি আরও জানান, হাই কোর্ট থেকে বৈধ সদস্যদের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তাঁরা প্রমাণপত্র দেখিয়ে নির্বাচনে যোগ দিয়েছিলেন। পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছিল রাজ্যের উচ্চ আদালত। ‘বহিরাগত তত্ত্ব’কে ভুয়ো বলে দাবি করেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে পাল্টা অভিযোগ জানান পিয়াও। তাঁর অভিযোগ, “মঙ্গলবার থেকে মানসিক নির্যাতনের শিকার। অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে আমাকে। গায়ের জোরে পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। এতে শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে সংগঠনের অফিসের।” সংগঠনের সদস্য শরৎ মুখোপাধ্যায়কে শারীরিক নিগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। সেই কারণেই সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে ইমপা অফিসে এবং অফিস চত্বরের আশপাশে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করা হয়। আদালত সেই লিখিত আবেদন পাঠিয়ে দেয় বৌবাজার থানাকে। আবেদন অনুযায়ী এ দিন সন্ধ্যায় অফিসে উপস্থিত আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানেরা এবং পুলিশ। জারি হয় ১৬৩ ধারা (সাবেক ১৪৪ ধারা)। একই সঙ্গে অফিসে কোনও রকম অশান্তি করা যাবে না, তারও নির্দেশ এসেছে আদালত থেকে।
পিয়ার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, পরিচালক জয়ব্রত দাসের ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’-এর ছবিমুক্তির জন্য আট লক্ষ টাকা চেয়েছিলেন তিনি। সে প্রসঙ্গে তাঁর কী জবাব? ইমপা সভাপতির যুক্তি, “ছবিটি মুক্তি পেলে প্রযোজক ব্যবসা করবেন। তা হলে কলাকুশলীরা কেন বঞ্চিত থাকবেন? এই ভাবনা থেকেই আট দিনের শুটিংয়ের জন্য মোট আট লক্ষ টাকা পরিচালককে ফেডারেশনের হাতে তুলে দিতে বলি। এতে কলাকুশলীরা তাঁদের প্রাপ্য পাবেন।” পিয়া জানান, তিনি পরে খবর পান শতদীপ ফেডারেশনের সঙ্গে বৈঠক করে ১২ লক্ষ টাকা সংগঠনের হাতে তুলে দেন! তাঁর প্রশ্ন, “আমি তো নতুন পরিচালকের মুখ চেয়ে কম পরিমাণ অর্থ দিয়ে ছবিমুক্তির ব্যবস্থা করেছিলাম। আমার নামেই এখন টাকা নেওয়ার মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে!”
পিয়ার বৈঠকের পর বৌবাজার থানার পুলিশ এবং স্পেশ্যাল ক্রাইম ব্রাঞ্চ অফিসার কথা বলেন বিরোধীপক্ষের প্রযোজকদের সঙ্গে। আলোচনায় যোগ দেন শতদীপ সাহা, মিলন ভৌমিক, রতন সাহা, কৃষ্ণ নারায়ণ দাগা-সহ অনেকেই। দফায় দফায় বৈঠক হয় ইমপা-র সভাপতি এবং কার্যনির্বাহী সদস্যদের সঙ্গেও।
বৈঠকশেষে শতদীপ সাংবাদিকদের বলেন, “আলোচনায় আমাদের নৈতিক জয় হয়েছে। শুক্রবার উভয় পক্ষের ১২ জন করে মোট ২৪ জন সদস্যকে নিয়ে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানেই আমরা দাবির কথা জানাব।” বিরোধীপক্ষের তরফ থেকে কী কী দাবি পেশ করা হবে? শতদীপের কথায়, “আমাদের দাবি একটাই। পিয়া সেনগুপ্তের পদত্যাগ। আমরা সংগঠনকে তৃণমূল কংগ্রেমুক্ত করতে চাই। বিনোদনদুনিয়া রাজনীতিমুক্ত হোক, এটাই লক্ষ্য।” সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নতুন সভাপতি কে হতে পারেন? আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রশ্নের জবাবে পাল্টা রসিকতায় মাতেন শতদীপ। বলেন, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মতো ইনিও তো গদি ছাড়তে চাইছেন না! কী করে বলি, কাকে সভাপতি পদে বসানো হবে?” আগামী দিনে কি তা হলে ইন্ডাস্ট্রিতে তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত অভিনেতা বা কলাকুশলীরা কাজ পাবেন না? শতদীপের জবাব, “এ রকম কিছুই ঘটবে না। তবে কর্মক্ষেত্রে রাজনীতি করা যাবে না, এটা চালু হবে। একই সঙ্গে উঠে যাবে ‘ব্যান’ সংস্কৃতি।”
শতদীপের আরও আক্ষেপ, “দেশের পাশাপাশি ইমপা-তেও এসআইআর প্রক্রিয়া চালু করা উচিত ছিল। তা হলেই বহিরাগতরা শনাক্ত হতেন। এখন ৪৫০-রও বেশি প্রযোজক-সদস্যদের তালিকা দেখানো হচ্ছে। তখন হয়তো দেখা যেত সঠিক সংখ্যা মাত্র ১০০!”