• বুলডোজ়ারে না, অশান্তিতে ব্যবস্থা না নিলে শাস্তির কোপে পুলিশও
    এই সময় | ০৭ মে ২০২৬
  • এই সময়: কোনও বিজয় মিছিলে থাকবে না বুলডোজ়ার বা আর্থমুভার— সেটা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর বার্তা দেওয়া হলো কলকাতা ও রাজ্য পুলিশকে। পাশাপাশি এটাও স্পষ্ট ভাষায় মনে করিয়ে দেওয়া হলো যে, ভোট পরবর্তী কোনও হিংসার ঘটনায় পুলিশ নিশ্চুপ হয়ে থাকলে তারাও শাস্তির হাত থেকে বাদ যাবে না। বাংলার নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অথবা রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য পদ্মের নেতা–কর্মীদের বার্তা দিয়েছেন, কোনও ভাবেই ভোট পরবর্তী হিংসা বরদাস্ত করা হবে না। বদলাতে হবে বাংলায় হিংসার চেনা ছবি। তারপরেও গত দু’দিনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হিংসা, অশান্তি, মৃত্যুর খবর এসেছে। এই অবস্থায় দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে শুরু করে রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা ও কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ এবং প্রতিটি জেলার এসপি ও কমিশনারেটের সিপি–রা হিংসা বন্ধে পুলিশ–প্রশাসনকে কড়া ব্যবস্থা ন‍েওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

    শুধুমাত্র দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র বাদ দিয়ে রাজ্যের বাকি অংশে বুধবার রাত ১২টায় নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি উঠে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আজ, বৃহস্পতিবার থেকে রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসন আর নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারে থাকছে না। এ দিন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল লোকভবনে গিয়ে রাজ্যপাল আরএন রবির হাতে এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি ও নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা তুলে দেন। তার আগেই অবশ্য দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বাংলায় ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে কঠোর বার্তা দেন রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের উদ্দেশে। যে ভাবে দু’দফায় বাংলায় রক্তপাতহীন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, তা যেন ভোটের ফল প্রকাশের পরে অব্যাহত থাকে— তাও নিশ্চিত করতে বলেন তিনি।

    সূত্রের দাবি, কমিশনের নির্দেশে মঙ্গলবার বেশি রাতে রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ শীর্ষ পুলিশকর্তা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্তাদের নিয়ে আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোট পরবর্তী অশান্তি রুখতে ইতিমধ্যেই রাজ্যে ৫০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ–কেন্দ্রীয় বাহিনীর শীর্ষকর্তাদের বৈঠকে ঠিক হয়, সব ধরনের হিংসা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং রাজনৈতিক কার্যালয় জোর করে দখলও কঠোর ভাবে রোধ করতে হবে। প্রয়োজনে পরিস্থিতি অনুযায়ী এলাকা ভিত্তিক বিএনএসএস–এর ১৬৩ (পূর্বতন সিআরপিসির ১৪৪) ধারা কার্যকর করতে পারবে স্থানীয় প্রশাসন। পাশাপাশি যে কোনও গোলমাল রুখতে থানা স্তরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ আরও জোরদার করা এবং ওসি–আইসিদের প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এলাকায় এলাকায় শান্তি বৈঠক করার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। ভোট-পরবর্তী শান্তি বজায় রাখতে যে সব পুলিশকর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী অফিসাররা কার্যকর, নিরপেক্ষ এবং নির্ভীক ভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের স্বীকৃতি ও পুরস্কার দেওয়ার কথাও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

    এই বৈঠকের পরেই বুধবার রাজ্যের বিভিন্ন স্তরের পুলিশকর্তা সাংবাদিক বৈঠক করে হিংসা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেন। মঙ্গলবারই কলকাতায় নিউমার্কেট তল্লাটে আর্থমুভার নিয়ে একদল পদ্ম সমর্থকের বিজয় মিছিলের ছবি প্রকাশ্যে এসেছিল। এ দিন কলকাতার সিপি অজয় নন্দ জানান, আর্থমুভার বা বুলডোজ়ার নিয়ে কোনও বিজয় মিছিল করা যাবে না। আর্থমুভার নিয়ে যাঁরা মিছিল করবেন তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ করা হবে। এমনকী আর্থমুভারর মালিক, যাঁরা বিজয় মিছিলের জন্য গাড়ি ভাড়া দেবেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কলকাতা ও লাগোয়া এলাকায় আর্থমুভার ভাড়া দেন, এমন সবাইকে এই বিষয়ে সর্তক করা হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার ক্ষেত্রেও যে একই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য, তা জানিয়ে দেন ডিজিপি সিদ্ধিনাথ।

    নন্দ এ দিন বলেন, ‘বিনা অনুমতিতে কোথাও বিজয় মিছিল করা যাবে না। কেউ সেটা করলে তা আটকানো হবে।’ কলকাতায় ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে সিপির দাবি, বিক্ষিপ্ত কিছু অশান্তি ছাড়া বড় কোনও ঘটনা ঘটেনি। এখনও পর্যন্ত ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা গোলমাল পাকাতে পারে, তাদের ধরার জন্য স্পেশাল ড্রাইভ চলছে। নন্দের কথায়, ‘যে উদ্দেশ্য নিয়ে পুলিশ কাজ শুরু করেছিল, যে ভাবে হিংসামুক্ত নির্বাচন হয়েছে, ভোটের ফলাফলের পরেও সেই শান্তিপূর্ণ অবস্থা যেন বজায় থাকে। যে সব ক্ষেত্রে ভাঙচুরের ঘটনায় কেউ নির্দিষ্ট ভাবে পুলিশে অভিযোগ করেননি, সেখানে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে মামলা রুজু করেছে।’ বাহিনীর উদ্দেশে তাঁর সতর্কবার্তা, ‘হিংসা বন্ধে পুলিশের কর্তব্যে গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনও জায়গায় ঘটনার সময়ে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও কোনও অ্যাকশন না নেয়, তা হলে তাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করা হবে। সেই পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’অন্য দিকে, ভবানীভবনে সাংবাদিক বৈঠকে সিদ্ধিনাথ জানান, রাজ্য পুলিশ এলাকায় ভোট পরবর্তী হিংসায় এখনও পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বেশ কয়েকটি গোলমালের খবর এসেছে। হুমকি, হেনস্থা, মারধর–সহ বিভিন্ন ঘটনায় দু’শোর বেশি এফআইআর হয়েছে। এখনও পর্য‍ন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৩৩ জনকে। প্রিভেন্টিভ অ্যারেস্ট করা হয়েছে ১১০০–এর বেশি অভিযুক্তকে। রাজ্য পুলিশ সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অশান্তির খবর এসেছে কোচবিহার, পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন অংশ, পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে। বসিরহাট ও ন্যাজাট এলাকায় দু’টি গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ঘটনাস্থলে গিয়ে ন্যাজাট থানার ওসি–সহ পাঁচজন জখম হন। ন্যাজাটের ঘটনায় এ দিন দুপুর পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

    ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের একটি যৌথ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে, যাতে কোনও অশান্তির খবর এলে দ্রুত সেখানে ফোর্সকে পাঠানো যায়। যে সব জায়গায় অশান্তি হচ্ছে, কিন্তু এফআইআর হচ্ছে না, সেখানে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

  • Link to this news (এই সময়)