তিলপাড়া ব্যারেজের অস্থায়ী কজওয়েতে টোল আদায়ের নামে কোটি কোটি টাকা লুট, আজ থেকে সংস্কার শুরু বন্ধ থাকবে যান চলাচল
বর্তমান | ০৭ মে ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা নেই। নদীগর্ভে স্রেফ গায়ের জোরে চলছিল এক সমান্তরাল ‘লুটের কারবার’। তিলপাড়া জলাধারের ‘স্বাস্থ্যহানি’কে হাতিয়ার করে ময়ূরাক্ষী নদীর উপর তৈরি হয়েছিল অস্থায়ী কজওয়ে। সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূতভাবে সেই কজওয়ে থেকে আদায় করা হচ্ছে ‘টোল’। সেই টাকার এক আনাও সরকারি কোষাগারে জমা না পড়ে সরাসরি চলে যাচ্ছে জেলার প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী ও তৃণমূল নেতাদের পকেটে। এবার সেই ‘সিন্ডিকেট’ বন্ধ হতে চলেছে বলে দাবি প্রশাসনের। বীরভূমের জেলাশাসক ধবল জৈন একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন, আজ, বৃহস্পতিবার থেকেই শুরু হচ্ছে সেতু সংস্কারের কাজ। তারজন্য আগামী ৫ জুন পর্যন্ত সেতুর উপর দিয়ে সমস্ত যান চলাচল বন্ধ থাকবে। যদিও প্রশ্ন উঠছে, এতকাল কোন অদৃশ্য হাতের ইশারায় থমকে ছিল এই জরুরি কাজ?
ঘটনার সূত্রপাত গত আগস্টে। তিলপাড়া জলাধারের জলবিভাজিকায় ফাটল দেখা দেওয়ায় প্রশাসনের তরফে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে সরাসরি প্রভাব পড়ে পাচামির পাথর শিল্পে। ট্রাকগুলিকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছিল। যার ফলে পরিবহণ খরচ বাড়ছিল পাল্লা দিয়ে। এই সমস্যার সমাধান করতেই ময়ূরাক্ষী নদীর উপর এই বিকল্প কজওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব দেন ট্রাক ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সেই প্রস্তাবের আড়ালে যে দুর্নীতির পাহাড় লুকানো ছিল তা এখন প্রকাশ্যে। স্থানীয় সূত্রের খবর, দীর্ঘ টালবাহানার পর জানুয়ারি মাস থেকে সেই কজওয়ে চালু হয়েছে। যদিও অভিযোগ, কোনোরকম সরকারি টেন্ডার, ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শ বা পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই ময়ূরাক্ষীর বুক চিরে এই কজওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই নদীগর্ভে গড়ে ওঠা এই কজওয়ে এখন কার্যত তৃণমূল ঘনিষ্ঠদের ‘টাকার খনি’।
সূত্রের খবর, ওই কজওয়ে পার হতে গাড়িপিছু ২০০টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে অন্তত তিন হাজার গাড়ি ওই পথে যাতায়াত করে। সেই হিসেবে দৈনিক আয় ৬ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মাস গেলে যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় দু’কোটির কাছাকাছি। এই কজওয়ে ব্যবহার না করলেও টাকা দিতে হত। পাচামি থেকে সাঁইথিয়া বা রামপুরহাটের দিকে যাওয়া গাড়িগুলিকেও পথ আটকে জোর করে ২০০টাকার টোকেন নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অভিযোগ, স্রেফ ক্ষমতার দাপট আর পেশিশক্তি কাজে লাগিয়ে এই জুলুমবাজি চলছে দিনরাত। নদীগর্ভে এভাবে সরকারি সিলমোহর ছাড়া ব্যক্তিগত স্বার্থে টোল আদায়ের আইনি অধিকার কে দিল? জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা এই প্রশ্ন শুনেই কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
তবে স্থানীয়দের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কেন ব্যারেজের মেরামতির কাজ এত মাস ফেলে রাখা হল? অভিযোগ উঠেছে, এই অবৈধ উপার্জনের রাস্তা খোলা রাখতেই প্রভাবশালীরা প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করে সংস্কারের কাজ পিছিয়ে দিচ্ছিল। একবার সংস্কার শুরু হয়েও রহস্যজনকভাবে তা থমকে গিয়েছিল। যদিও প্রশাসনের এক কর্তার দাবি, নির্বাচনের কথা ভেবেই সেতু সংস্কার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অবশেষে সেই সেতুর সংস্কারের কাজ শুরু হতে চলেছে। জেলাশাসক জানিয়েছেন, আজ ৭মে থেকে আগামী ৫জুন পর্যন্ত সেতুর সংস্কার চলবে। তারপর সেতুর উপর দিয়ে সব ধরনের গাড়ি যাতায়াত করতে পারবে। অর্থাৎ, এখনও মাসখানেক কজওয়ে থেকে চলবে লুটের করবার।
তৃণমূলের জেলা সহ সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, মানুষকে সুবিধা দেওয়ার নামে ছল করে কোটি কোটি টাকা লুট হচ্ছে। কিন্তু সুরাহা কিছু হচ্ছে না।