বসিরহাট থেকে বারাসত, আইএসএফের উত্থানে রাজনৈতিক সমীকরণ ঘিরে চর্চা, দ্বিতীয় স্থান পেলেও ভালোই ভোট পেয়েছে নৌশাদের দল
বর্তমান | ০৭ মে ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: উত্তর ২৪ পরগনার নির্বাচনি ফলাফল এবার শুধু সংখ্যার নিরিখে নয়, রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। বসিরহাট থেকে বারাসত— একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটের অঙ্ক খতিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, লড়াই কার্যত সীমাবদ্ধ থেকেছে তৃণমূল ও আইএসএফের মধ্যে। সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেসের প্রার্থী থাকলেও তারা ভোট-রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, গোটা রাজ্যে গেরুয়া ঝড় উঠলেও এইসব অঞ্চলে বিজেপির অস্তিত্ব কার্যত বিলীন।
বসিরহাট ও বারাসত মহকুমায় অন্যতম কেন্দ্র হল মিনাখাঁ। এখানে তৃণমূল প্রার্থী ঊষারানি মণ্ডল পেয়েছেন ৯২ হাজার ৭৯টি ভোট। বিপরীতে আইএসএফ প্রার্থী প্রতীক মণ্ডল ৫৫ হাজার ৭৫৩ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। বিরোধী ভোটের স্রোত যে আইএসএফের দিকে, তা স্পষ্ট। পাশের কেন্দ্র হাড়োয়ায় তৃণমূল প্রার্থী আব্দুল মাতিন পেয়েছেন ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৫৯১ ভোট। সেখানে আইএসএফের ঝুলিতে গিয়েছে ৬৮ হাজার ২৫০টি ভোট। এখানেও একই প্রবণতা। এই দুই কেন্দ্রে বিজেপি বা কংগ্রেস কেউই আইএসএফের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেনি। দেগঙ্গা বিধানসভায় লড়াই আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল প্রার্থী আনিসুর রহমান ১ লক্ষ ১ হাজার ১১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আইএসএফ প্রার্থী মহম্মদ মফিদুল হক সাহাজি পেয়েছেন ৮৩ হাজার ২৯৬ ভোট। ব্যবধান মাত্র ১৭ হাজার ৮১৮। এই ফল সরাসরি তৃণমূল বনাম আইএসএফের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্য দলগুলি এখানে কার্যত প্রান্তিক। বসিরহাট উত্তর কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রাপ্তি ১ লক্ষ ১৫ হাজার ৫০৩ ভোট। সেখানে আইএসএফ ৫৮ হাজার ২৩৩ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে। বাদুড়িয়া বিধানসভায় তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছেন ১ লক্ষ ৩ হাজার ৩৪৪ ভোট আর আইএসএফ পেয়েছে ৪৯ হাজার ৭০০। এখানেও কংগ্রেস, বিজেপি— কেউই আইএসএফের ধারেকাছে আসতে পারেনি। অর্থাৎ, বিরোধী ভোটের বড় অংশই সংগঠিতভাবে আইএসএফের দিকে সরে গিয়েছে। এই সব কেন্দ্র মিলিয়ে যে সামগ্রিক ছবি উঠে আসছে, তা হল— বিরোধী রাজনীতির চরিত্রে পরিবর্তন স্পষ্ট। আগে যেখানে তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে সিপিএম বা কংগ্রেসকে দেখা হত, সেখানে এখন সেই জায়গা দখল করছে আইএসএফ। সংখ্যার বিচারে আইএসএফের ভোটপ্রাপ্তি ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে একাধিক কেন্দ্রে, যা একটি সুসংগঠিত ও নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল বিজেপির অবস্থান। এই সব কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী থাকলেও ভোটের অঙ্কে তাদের উপস্থিতি কার্যত অদৃশ্য। তারা অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ এখানে ভিন্ন পথে এগচ্ছে। বিজেপি নয়, তৃণমূলের বিপরীতে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে আইএসএফ।
সব মিলিয়ে, উত্তর ২৪ পরগনার এই নির্বাচনি ফল কেবল আসনভিত্তিক জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের আভাস। তৃণমূল বনাম আইএসএফ— এই নতুন সমীকরণ, বিরোধী ভোটের পুনর্বণ্টন এবং বিজেপির প্রান্তিক হয়ে পড়া, সব মিলিয়ে জেলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।