• রাতে গুলি, ভোট-হিংসায় খুন শুভেন্দুর আপ্ত সহায়ক, প্রয়োজনে কার্ফু জারি, ডিজির কড়া বার্তাও বিফলে
    বর্তমান | ০৭ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: পালাবদলের জের। রাজ্যে থামতেই চাইছে না ভোট পরবর্তী হিংসা। এ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে গত ৪৮ ঘণ্টায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। স্বয়ং ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা নির্দেশ দিয়েছেন, প্রয়োজনে কার্ফু জারি করতে হবে জেলা প্রশাসনকে। কিন্তু, সেই হুঁশিয়ারির পরই রাতে খুন হলেন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের জয়ী বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে প্রকাশ্য রাস্তায় তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুই অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতী। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনায় অভিযোগের তির তৃণমূলের দিকে। যদিও তৃণমূল ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে। পাশাপাশি আদালতের পর্যবেক্ষণে ভোট পরবর্তী হিংসায় সিবিআই তদন্তের দাবিও জানিয়েছে। বারাসত পুলিশ জেলার এসপি পুষ্পা জানিয়েছেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশের অনুমান, হামলাকারীরা পেশাদার ভাড়াটে খুনি। রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছন শুভেন্দু অধিকারী সহ বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার ও ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা। 

    জানা গিয়েছে, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী চন্দ্রনাথের আদি বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে। এককালে সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। তাঁর মা পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য ছিলেন। গত পাঁচ বছর ধরে শুভেন্দুর আপ্ত সহায়ক হিসেবে কাজ করছিলেন চন্দ্রনাথ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সময় চালকের পাশের আসনে বসেছিলেন তিনি। দোহারিয়া এলাকায় প্রথমে একটি গাড়ি সামনে থেকে এসে চন্দ্রনাথের গাড়ির পথ আটকায়। তখনই বাইকে চেপে দুই দুষ্কৃতী সেখানে হাজির হয়ে এলোপাথাড়ি ১০-১২ রাউন্ড গুলি চালায়। গাড়ির কাচ ভেদ করে চন্দ্রনাথের শরীরে-মাথায় গুলি লাগে। গুরুতর আহত হন গাড়ির চালক বুদ্ধদেব বেরাও। এরপর চন্দ্রনাথকে নিউ বারাকপুরের কাছে একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। নার্সিংহোম চত্বরে বিশাল বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিজেপির কর্মী-সমর্থকরাও সেখানে জমায়েত করে গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। ইতিমধ্যেই এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। শুধু মধ্যমগ্রাম নয়, বুধবার রাতে উত্তর ২৪ পরগনারই সোদপুর এবং বসিরহাটে ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনা ঘটেছে। জানা গিয়েছে, সোদপুরের দত্ত রোড এলাকায় বোমাবাজিতে বেশ কয়েকজন জখম হয়েছেন। আর বসিরহাটের গোত্রা এলাকায় এক বিজেপি কর্মী গুলিতে জখম হয়েছে বলে খবর। 

    ভোট-হিংসা রুখতে রাজ্যজুড়ে বাহিনী মোতায়েন করা হলেও কাজের কাজ হচ্ছে না। মঙ্গলবার রাতে কোচবিহারের সিতাইয়ে তৃণমূল সমর্থক মুন্নাফ মিয়ার বাড়িতে হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতী। অগ্নিসংযোগ করা হয় বেশ কিছু বাড়িতে। প্রতিবাদ করায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেওয়া হয় তাঁর মাথায়। গভীর রাতে কোচবিহারের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। আবার কোচবিহারের তুফানগঞ্জ এবং উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় আক্রান্ত হয়েছেন দুই বিজেপি কর্মী। এদিন  সকাল থেকে আসানসোল, নন্দীগ্রাম, রঘুনাথপুর, আরামবাগ, রামপুরহাট, ঝাড়গ্রাম, বনগাঁ এবং মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক হিংসার আগুন। অগ্নিসংযোগ করা হয় তৃণমূলের একাধিক কার্যালয়ে। ভাঙচুর চালানো হয় কর্মীদের বাড়ি, দোকানে। এমনকি বাড়ির মহিলারাও কটূক্তির শিকার হন।

    ভোট পরবর্তী হিংসার এই পরিস্থিতিতে কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।  এদিন শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়ে বৈঠক করতে নবান্নে গিয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি  ভোট পরবর্তী হিংসা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আরজি জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র সচিব সংঘমিত্রা ঘোষের কাছে। সূত্রের খবর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অবজার্ভার, পুলিশ অবজার্ভার, ডিজি সিআরপিএফ, ডিজি বিএসএফ এবং ডিজি সিআইএসএফকে নিয়ে বৈঠক করেন রাজ্যের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা। এই বৈঠকের পরেই জেলায় জেলায় থানাস্তর পর্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বার্তা পৌঁছে যায়। এদিন সকালে ভবানী ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে ডিজি বলেন, ‘ভোট পরবর্তী হিংসা ঠেকানোর ক্ষেত্রে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছি। অশান্তি সৃষ্টিকারী কাউকে রেয়াত করা হবে না। দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ভোট পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত ২০০টি এফআইআর রুজু হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৩৩ জন। আগাম সতর্কতামূলক গ্রেপ্তারির সংখ্যা ১১০০। কলকাতা পুলিশ এলাকায় ৩৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ১০০ জন। বাজেয়াপ্ত হয়েছে তিনটি বন্দুক ও ছ’রাউন্ড গুলি। কলকাতার নগরপাল অজয় নন্দাও গুজবে কান না দেওয়ার আরজি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতা এলাকায় ৬৫ কোম্পানি বাহিনী এবং ৪০টি কুইক রেসপন্স টিম মোতায়েন করা হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া মিছিলেও জারি করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
  • Link to this news (বর্তমান)