• কৌলিন্য হারাচ্ছে নবান্ন, এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া
    বর্তমান | ০৭ মে ২০২৬
  • সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া; ২০১৩ সাল। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার মাত্র দু’বছরের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৩৩ বছরের ঐতিহ্যকে পিছনে ফেলে লাল ইটের ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিং থেকে প্রশাসনের হৃদস্পন্দন সরিয়ে এনেছিলেন হাওড়ার নবান্নে। সেই সময়টাকে অনেকেই দেখেছিলেন পরিবর্তনের প্রতীক হিসাবে। নবান্নের ব্যস্ত করিডর ছেড়ে গেরুয়া শাসনের সচিবালয় এবার ফিরে যাচ্ছে রাইটার্সের পুরানো অলিন্দে। গত ১৩ বছরে মন্দিরতলা ও আশপাশের বাসিন্দারা চোখের সামনে দেখেছেন নবান্নের উত্থান, ১৫ তলা ভবনের ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে ওঠা, কড়া নিরাপত্তা, তার সঙ্গে বদলে যাওয়া এলাকার জীবনযাত্রা। এখন সেই অধ্যায়ের অবসান হতে চলেছে। কেউ রয়েছেন নিরাপত্তা হারানোর আশঙ্কায়, কেউ বা দৈনন্দিন ঝক্কি থেকে স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন এই সিদ্ধান্তে।

    নবান্ন বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া ওঙ্কারমাল জেটিয়া রোডে বাপ্পা গোস্বামীর চা ও রেডিমেড খাবারের দোকান গত ২৫ বছর ধরে এলাকায় পরিচিত ঠিকানা। দিনভর ভিড় লেগেই থাকত। এখন সেই ভিড় আর নেই। বাপ্পার কথায়, ‘এলাকাটি হাই-সিকিউরিটি জোন ছিল, নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্তে ছিলাম। রাতবিরেতে কখনও সমস্যা হয়নি।’ পাশের একটি জনপ্রিয় বাঙালি রেস্তরাঁর কর্মী ও কর্ণধারদের অভিমত, ‘দুপুরে যে উপচে পড়া ভিড় হত, তাতে প্রভাব তো পড়বেই। নবান্নের অনেক কর্মী ক্যান্টিন ছেড়ে এখানে খেতে আসতেন।’ তবে অন্য ছবি তুলে ধরেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। বলাই মিস্ত্রি লেনের গৌরীশংকর সেনগুপ্ত, তাপস চক্রবর্তী ও সনাতন শিকদারদের মতে, ‘নবান্ন অভিযান হলেই এলাকা কার্যত লকডাউন হয়ে যেত। ব্যারিকেডে বন্ধ থাকত রাস্তাঘাট। অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়ত। সেই ভোগান্তি আর হবে না।’

    একই সুর আরও স্পষ্টভাবে শোনা যায় ক্ষেত্র ব্যানার্জি লেন, হীরালাল ব্যানার্জি লেন ও শরৎ চ্যাটার্জি রোডের বাসিন্দাদের মুখে। তাঁদের বক্তব্য, ‘বাড়ির একেবারে কাছেই নবান্ন থাকায় নিরাপত্তা ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই নিরাপত্তার চাপে নিত্যদিনের জীবন যেন অনেকটাই বাঁধা পড়ে গিয়েছিল। ছাদে ওঠা থেকে শুরু করে বাড়ির সামান্য মেরামত— সব ক্ষেত্রেই বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হত। অনেকেই তিনতলার উপর বৈধভাবে নির্মাণ করতে চেয়েও অনুমতি পাননি, নিরাপত্তার অজুহাতে আবেদন খারিজ হয়ে যেত।’ শুধু বাসিন্দারা নন, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন নবান্নের বহু কর্মীও। তাঁদের কথায়, ‘শিয়ালদহে নেমে হেঁটে রাইটার্স যাওয়া যেত আগে। এখন হাওড়া আসতে বাড়তি খরচ, দেরি হলে বাড়ি ফিরতেও সমস্যা। এবার সেই ঝামেলা কমবে।’ সব মিলিয়ে, নবান্নের বিদায়বেলায় মিশে আছে নস্টালজিয়া, স্বস্তি আর অনিশ্চয়তার এক অদ্ভুত মিশেল— যেন হাওড়ার বুক থেকে মুছতে চলেছে দীর্ঘদিনের এক ঠিকানা।
  • Link to this news (বর্তমান)