• জুটমিলের কর্মী থেকে মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহের পাত্র, ৫০২ কিমি হেঁটেই প্রচার প্রাক্তন শ্রমিক নেতার
    এই সময় | ০৭ মে ২০২৬
  • প্রদীপ চক্রবর্তী সিঙ্গুর

    শ্রীরামপুর ইন্ডিয়া জুটমিলে কাজ করার সুবাদেই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় মালিক পক্ষের থেকে দাবি আদায়ে শ্রমিকদের মনে দাগ কেটেছিলেন চটকলের শ্রমিক বেচারাম মান্না। গ্রামের বাড়ি থেকে উঠে আসা, লড়াকু মানসিকতার শ্রমিক নেতাকে লম্বা রেসের ঘোড়া বলে মনে হয়েছিল রাজনৈতিক মহলের। ১৯৯৩ সালে সিঙ্গুর ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে প্রথম ভোটে জেতেন। তার পরে ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের টিকিটে পঞ্চায়েত ও ২০০৮ সালে পঞ্চায়েত সমিতি থেকে জিতলেও, ২০০৬ সালে সিঙ্গুরের জমিরক্ষার আন্দোলন বেচারাম মান্নার রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষটি সিঙ্গুরে জমিরক্ষার লড়াইয়ে জীবন বাজি রাখেন। পুলিশি নির্যাতন থেকে মিথ্যে মামলা ছাড়াও, শত প্রলোভনেও টলানো যায়নি বেচারাম মান্নাকে।

    সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা কমিটির ব্যানারে সিঙ্গুরের জমিরক্ষার আন্দোলনে সারা বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জোর করে কৃষিজমি রক্ষার লড়াইয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করেন। সিঙ্গুরে জমিরক্ষা আন্দোলনের সেনাপতি বেচারাম মান্নাকে নিয়েই সিঙ্গুরের দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে ধর্না ও অনশন আন্দোলন করে বাম সরকারের স্নায়ুর চাপ বাড়িয়ে দেয় তৃণমূল। রাজ্যের পালাবদলে নন্দীগ্রামের মতোই সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলে হরিপাল কেন্দ্র থেকে ভোটে জয়ী হন বেচারাম মান্না। ২০১৬ সালেও হরিপাল ও ২০২১ সালে সিঙ্গুর থেকে দু’বার বিধায়ক, মন্ত্রী হন। এবারেও সিঙ্গুরে নেত্রীর ‘কাছের লোক’ বেচারামের উপরেই ভরসা রেখেছে দল।

    দল ক্ষমতায় আসার পরেও খেতমজুর ও কিষানদের নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ— রাজ্যজুড়ে বিজেপি–বিরোধী মানুষকে একজোট করে জোড় লড়াই দিয়েছেন তিনি। করোনা কালে অনলাইনে ভার্চুয়ালি খেতমজুর ও কিষানদের বিরাট সম্মেলন করে, নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন জিতে নেন।ক্ষুরধার সাংগঠনিক কৌশলে জেলার অনেক রাজনৈতিক সহকর্মীর কাছে তিনি ঈর্ষার কারণ। তবে দল ক্ষমতায় ও তিনি মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও, মাটির মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন বেচারাম। নিজের বাড়ির অফিস থেকে সিঙ্গুরে একাধিক অফিসে থেকে সাধারণ মানুষের অভাব–অভিযোগ শুনে জনসংযোগ সারেন পোড় খাওয়া তৃণমূল নেতা। শুধু তাই নয়, কামারকুন্ডু ওভার ব্রিজ থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে আন্ডারপাশের দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি, সাইকেল নিয়ে সিঙ্গুর থেকে কলকাতার রাজপথে মিছিল করে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন তিনি। চলতি মরশুমে আলুর ফলনে দিশেহারা কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে, সরকারের হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আলুর বণ্টন, সহায়ক মূল্যে কৃষকের আলু বিক্রি ও কৃষি বিপণন দপ্তরকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বেচারাম মান্না দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাই, এ বারের নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা গাড়ি, টোটোর মতো বিভিন্ন যানে প্রচার করলেও, বেচারাম মান্না এখনও পর্যন্ত সিঙ্গুর বিধানসভার প্রায় ৫০২ কিমি এলাকা পায়ে হেঁটে প্রচার করেছেন। গ্রামের লোকজন বেচারামকে পায়ে হেঁটে প্রচার করতে দেখে তাঁর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছেন। পায়ে হেঁটে গ্রামের বাড়ির অলিগলি ও আনাচে কানাচে বেচারামের অবাধ প্রচারে, বিরোধীরা ব্যাকফুটে বলে মনে করছেন গ্রামবাসীরা।

    সিঙ্গুরের পাশাপাশি, পাশের কেন্দ্র হরিপালে নিজের স্ত্রী তথা তৃণমূল প্রার্থী করবী মান্নার জন্য একই ভাবে প্রচার করছেন বেচারাম মান্না। সকাল সাড়ে আটটা থেকে সকাল সাড়ে ১০টা। এর পরে হাল্কা ছোলা–মুড়ি, শসা খেয়ে ১১টা থেকে দুপুর দুটো। ফের দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল চারটে থেকে রাত ১০টা–১১টা পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি প্রচার, কর্মিসভা করে ঘরে ফেরেন। এ বিষয়ে বেচারাম মান্না বলেন, ‘রাজনীতিতে সংগঠন মজবুত যার, ভোটের ময়দানে জমিও তার। আমি পুরোনো কর্মী। সারা বছর নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা যাবতীয় প্রকল্পের পরিষেবা সাধারণ মানুষকে দিয়ে এসেছি। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সব কিছু করতে পারিনি। কিন্তু যেটা করেছি, একদম ১০০ ভাগ করেছি। আমার এখানে সংগঠন পিরামিডের মতো। তাই একদম পায়ে হেঁটেই মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছি। জিতে আসার পরে একটা দমকল কেন্দ্র, সিঙ্গুর গ্রামীণ হাসপাতালকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে পরিণত করার পাশাপাশি, সিঙ্গুর বিডিও অফিসের সামনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটা সভাকক্ষ তৈরি করার ইচ্ছে আছে।’

  • Link to this news (এই সময়)