• বাংলায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ওই সিটগুলি কীভাবে BJP জিতল? বিপ্লব দেবের 'ধুরন্ধর' স্ট্র্যাটেজি
    আজ তক | ০৭ মে ২০২৬
  • বিপ্লব দেবকে যেদিন পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিজেপি, সেই সিদ্ধান্ত নিছকই একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত ছিল না। তার নেপথ্যে ছিল বিপ্লব দেবের দুর্দান্ত রাজনৈতিক রেকর্ড। বস্তুত, এই সেই বিপ্লব দেব, যিনি ত্রিপুরায় বাম সরকারকে সরানোর অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন। এবার দায়িত্ব নিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও সফল। পরিবর্তন ঘটে গেল বাংলাতেও। 

    ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দুই ২৪ পরগনার ৪৯টি সংবেদনশীল আসনকে বিশেষ ভাবে ফোকাসে রেখেছিলেন বিপ্লব দেব। এই ৪৯টি আসনে বিজেপি-র পারফর্ম্যান্স খুব খারাপ ছিল। বলা যেতে পারে, তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটিগুলির অন্যতম। ওই সবকটি আসনেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী ছিল। ওই দুর্ভেদ্য নেটওয়ার্ক ভেঙে বিজেপি-কে ঘুরে দাঁড় করানোর মোক্ষম স্ট্র্যাটেজি ছকে ফেলেন বিপ্লব।

    ৪৯টি আসনের মধ্যে ২৫টি আসন বিজেপি সরাসরি তৃণমূলের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে

    ওই ৪৯টি আসনের মধ্যে ২৩টিতে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। তা সত্ত্বেও ২৬টি আসনে বিজেপি জয়ী। তৃণমূল ২১টি আসনে ও কংগ্রেস দুটি আসনে জয়ী। বিজেপি-র এই আসনগুলিতে জয় স্রেফ রাজনৈতিক সাফল্যই নয়, কোন জায়গাগুলিতে বিজেপি জিতল, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি-র একটি সূত্রের বক্তব্য, ৪৯টি আসনের মধ্যে ২৫টি আসন বিজেপি সরাসরি তৃণমূলের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। যেগুলি বিজেপির কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল। ২০২১ সালের নিরিখে দেখতে গেলে, সে বার দ্বিতীয় দফার ভোটে ১৪২টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৮টিতে জয় পেয়েছিল বিজেপি। ২০২৬ সালে বিপ্লব দেব তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রগুলিতে বিজেপির পারফর্ম্যান্স তাই দলের সাংগঠনিক মহলে বিশেষ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজেপি সূত্রের দাবি, বাংলায় বিপ্লব দেবের কৌশলের অন্যতম ভিত্তি ছিল বামপন্থী সমর্থক ও সংগঠনের একাংশের অসন্তোষকে কাজে লাগানো এবং সেই ক্যাডার নেটওয়ার্ককে নিজেদের পক্ষে টেনে আনা।

    বিপ্লব দেব প্রাক্তন বাম নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন রুদ্ধদ্বার

    বুথ লেভেলে ক্যাডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা

    বিজেপির মধ্যে একাধিক নেতাও স্বীকার করছেন, বিপ্লব দেব ধীরে ধীরে বিজেপি-কে ওই সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। বিশেষ করে বামমনস্ক নেতা, কর্মীদের। শুধু ত্রিপুরাতেই নয়, বাংলা ও কেরলেও। তাঁর রাজনীতির স্টাইল হল, বুথ লেভেলে ক্যাডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা।  বিপ্লব দেবের নিজের রাজনৈতিক যাত্রাপথই ব্যাখ্যা করে, কেন কঠিন নির্বাচনী পরিস্থিতিতে বিজেপি নেতৃত্ব বারবার তাঁর উপর ভরসা করে। ২০১৫ সালে তিনি যখন ত্রিপুরার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করেন, তখন সেখানে বিজেপির সংগঠন কার্যত অস্তিত্বহীন ছিল। বুথ বা মণ্ডল স্তরের ন্যূনতম সাংগঠনিক কাঠামোও গড়ে ওঠেনি। সেই পরিস্থিতিতে দেব নিজেকে পুরোপুরি সংগঠন গঠনের কাজে নিয়োজিত করেন এবং বিজেপির সদস্যতা অভিযানকে হাতিয়ার করে অল্প সময়ের মধ্যেই দলের প্রভাব দ্রুত বিস্তার করেন।

    ২০১৬ সালে তাঁকে ত্রিপুরা বিজেপির সভাপতি করা হয়

    মিসড কল মেম্বারশিপে বিজেপি-র দেড় লক্ষের বেশি সদস্য যুক্ত হন।  দলের নেতারা স্মরণ করেন, বিপ্লব দেব ব্যক্তিগতভাবে নতুন সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এমনকী বহু ক্ষেত্রে তিনি সেই সব সিপিএম নেতাদের বাড়িতেও গিয়েছেন, যাঁদের পরিবারের সদস্যরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তৃণমূল স্তরে তাঁর আগ্রাসী সাংগঠনিক প্রচার খুব দ্রুতই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নজর কাড়ে। এরপর ২০১৬ সালে তাঁকে ত্রিপুরা বিজেপির সভাপতি করা হয়। মাত্র দু’বছরের মধ্যেই ত্রিপুরার রাজনীতিতে ঘটে যায় সাম্প্রতিক ভারতের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পালাবদল। ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৬০টির মধ্যে ৩৬টি আসনে জয়ী হয়ে টানা ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটায়।

    বিপ্লব দেব ত্রিপুরার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হন। এই সাফল্য তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং অঞ্চলে বিজেপির অন্যতম সফল সাংগঠনিক মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দলেও ব্যাপকভাবে গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে বিপ্লবের। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ত্রিপুরা পশ্চিম আসনে ৮ লক্ষ ৮১ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বামেদের হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেই একটি শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিণত হয়। এমন একটি সংগঠনের মোকাবিলা করতে গেলে বিজেপির এমন নেতার প্রয়োজন, যিনি ক্যাডার-ভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি বোঝেন। বিপ্লব দেব অতীতে সেই কাজ সফলভাবে করে দেখিয়েছেন।'
  • Link to this news (আজ তক)