• ‘আমিও তো মা, চাইব না ওদের ফাঁসি হোক’, বলেছেন চন্দ্রনাথের মা হাসিরানি
    এই সময় | ০৮ মে ২০২৬
  • পুলক বেরা, তমলুক

    শোক স্তব্ধ করেছে তাঁকে। চিৎকার করে কাঁদেননি। সন্তানহারা মা ধীর কণ্ঠে সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, 'আমিও তো মা। আমি চাইব না ওদের ফাঁসি হোক। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চাই ওদের।' তিনি হাসিরানি রথ — শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক নিহত চন্দ্রনাথ রথের মা। তাঁর সন্তান হারানোর জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের মৃত্যুকামনা করতে পারেননি তিনি। নিজে মা বলেই...

    পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরের কুলুপ গ্রামে বুধবার রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এসেছিল খবরটা। সেখানেই ছোট ছেলে সৌমেন্দ্র ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে থাকেন হাসিরানি। লোকমুখে খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশিক্ষণ লাগেনি। রাত জেগেছে গোটা এলাকা। শোকে, উদ্বেগে। ক্ষোভেও। ততক্ষণে সংবাদমাধ্যমে দেখে খবরটা জানতে পেরেছেন অন্য এলাকায় থাকা আত্মীয়–স্বজন–পরিচিতরা। তার পর থেকে লোকের আসার বিরাম নেই হলুদ রংয়ের দোতলা বাড়িটায়।

    বছর চারেক আগে স্বামী ওঙ্কারপদ রথকে হারিয়েছেন বিজেপির সক্রিয় কর্মী হাসিরানি। নিজে ২০১৩–২০১৮ পর্যন্ত চণ্ডীপুর পঞ্চায়েত সমিতির শিশু ও নারী উন্নয়ন কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন। বড় ছেলের মৃত্যুতে তৃণমূলের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি। বলেছেন, 'ও যদি দুর্ঘটনায় মারা যেত, আমার এত কষ্ট হতো না। আমরা বিজেপি করতাম। ভোটের সময়ে তৃণমূলের নেতারা যে ভাবে গরম গরম ভাষণ দিয়েছিলেন, দেশের কোনও বাপ রক্ষা করতে পারবে না বলেছিলেন, সেটাই তাঁরা করে দেখিয়ে দিলেন। এটা পরিকল্পিত হত্যা।'

    বৃহস্পতিবার সারা দিন ধরে কখনও চোখের জল মুছেছেন, কখনও থম মেরে বসে ছিলেন শূন্য দৃষ্টিতে। শোকের ধাক্কা সামলাতে না পেরে মাঝে দেহ এলিয়ে দিয়েছেন বিছানায়। বিড়বিড় করে বলে উঠেছেন, 'পাড়ার ক'টা লোক জানত, ও আসলে কী কাজে যুক্ত? ওর কোনওদেখনদারি ছিল না। চুপচাপ নিজের কাজটুকু করত।'

    ছোট ছেলে সৌমেন্দ্র রথ সেচ দপ্তরের কর্মী। তাঁর স্ত্রী ও এক মেয়ে রয়েছে। তাঁরা জানালেন, গত আট বছর ধরে স্রেফ শুভেন্দুর আপ্ত সহায়ক ছিলেন না চন্দ্রনাথ, কাঁথির অধিকারী পরিবারের সদস্যের মতোই ছিলেন। শুভেন্দু যখন তৃণমূলে ছিলেন, তখন রথ পরিবারও তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিলে তাঁরাও বিজেপিতে যোগ দেন।

    চন্দ্রনাথের জেঠু হরিপদ রথ জানিয়েছেন, পড়াশোনা শেষে ভারতীয় সেনায় যোগ দিয়েছিলেন চন্দ্রনাথ। ছুটিতে বাড়িতে এলেই শান্তিকুঞ্জে (অধিকারীদের বাড়ি) যেতেন। ২০১৭–এ অবসর নেওয়ার পরে ২০১৮ থেকে শুভেন্দুর সহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। শুভেন্দুর রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিটিং এবং কৌশল নির্ধারণে তিনি ছিলেন নেপথ্যের অন্যতম ভরসাযোগ্য ব্যক্তি। এ দিন শুভেন্দুর সুরেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন হরিপদ। বলেছেন, 'ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারীর জয়ের ক্ষেত্রে চন্দ্রনাথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই কারণেই তিনি অনেকের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। তার জেরেই এই নৃশংস খুন।'

    বুধবার দুপুরেই মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল চন্দ্রনাথের। বাড়িতে রান্না করা খাবার খেয়েই কলকাতা রওনা হয়েছিলেন। চন্দ্রনাথের মামা কৌশিক দাসের কথায়, 'গত ২৩ এপ্রিল ভোট দিতে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। বুধবার সকালে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে নন্দীগ্রামে আসে। শুভেন্দু ফিরে গেলেও দুপুরে চণ্ডীপুর কেন্দ্রের জয়ী বিজেপি প্রার্থী পীযূষকান্তি দাসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য থেকে যায়। চন্দ্রনাথকেও চণ্ডীপুর পার্টি অফিসে সংবর্ধনা জানানো হয়। আমরা সবাই চণ্ডীপুর বাজারের একটি গেস্ট হাউসে ছিলাম। ওর মা রান্না করে সেখানে নিয়ে এসেছিল। সেই খাবার চন্দ্রনাথ খেয়েছিল। বৃহস্পতিবার নিজের মাসতুতো বোনের বিয়েতে থাকবে বলেছিল।' সেই বিয়ে এ দিন বাতিল হয়ে যায়।

    বৃহস্পতিবার সন্ধে ছ'টা নাগাদ কলকাতা থেকে গ্রামে পৌঁছয় চন্দ্রনাথের দেহ। রাস্তায় কোলাঘাট থেকে গ্রামের মোড় পর্যন্ত একাধিক বার শববাহী গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফুল–মালায় শ্রদ্ধা জানান বিজেপিকর্মীরা। বাড়ির সামনের মাঠে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। চণ্ডীপুর বাজার থেকে বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দু'পাশে মোতায়েন ছিল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রাক্তন সেনাকর্মীরা জাতীয় পতাকা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান চন্দ্রনাথকে। পরে ফুল-মালা দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিজেপির জয়ী প্রার্থী, সাংসদ ও জেলা নেতৃত্ব। শুভেন্দু ছিলেন না। কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় শুভেন্দুর দুই ভাই সৌমেন্দু ও দিব্যেন্দু অধিকারীকে। হাজার হাজার মানুষের ভিড় তখন গ্রামে। প্রতিবেশী গণেশচন্দ্র মণ্ডল ও স্বরূপ মাইতির কথায়, 'আমরা অভিভাবক হারালাম। কলকাতায় ডাক্তার দেখানো হোক বা আর্থিক সাহায্য, চন্দ্রদা সবসময় হাত বাড়িয়ে দিতেন। রাতবিরেতে ফোন করলেও কখনও বিরক্ত হননি।'

    ধীরে ধীরে বাড়ির সামনে পৌঁছয় শববাহী গাড়ি। সন্তানকে শেষ বারের মতো দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা।

  • Link to this news (এই সময়)