নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: রাজ্যে পালাবদল ঘটেছে। নবান্ন জয়ের পর এবার বিজেপির পাখির চোখ তৃণমূলের ‘দুর্ভেদ্য’ দুর্গ হিসেবে পরিচিত পঞ্চায়েত ও পুরসভাগুলি। ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বীরভূমের ১৬৭টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে প্রায় ১৬০টিই দখল করেছিল শাসকদল। জেলার ছ’টি পুরসভাও বর্তমানে তৃণমূলের কব্জায়। সিংহভাগ আসন এসেছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যেতেই এখন পঞ্চায়েত ও পুরসভাগুলি দখলে টার্গেট করছে বিজেপি।
বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, গত পঞ্চায়েত ও পুর নির্বাচনে বীরভূমে গণতন্ত্রের লেশমাত্র ছিল না। বিরোধীদের মারধর, হুমকি আর মনোনয়ন পেশে বাধা দিয়ে কার্যত গায়ের জোরে বোর্ড গঠন করেছিল তৃণমূল। সেই অভিযোগের পালে হাওয়া দিয়েছে সিউড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান তথা পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি। তিনি নিজেই কবুল করেছেন যে, জোর করে পুরসভা দখল করাটাই তাঁদের জন্য ‘কাল’ হয়েছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারেননি। এই প্রেক্ষাপটেই বীরভূম থেকে ‘তৃণমূলি শাসন’ উপড়ে ফেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বিজেপি।
২০১৮সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বীরভূমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের যে ধারা তৈরি হয়েছিল তা রাজ্য রাজনীতিতে ‘বীরভূম মডেল’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সেবার পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতির অধিকাংশ আসনের পাশাপাশি জেলা পরিষদের সবকটি আসনেই বিনা ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। ২০২৩-এও সেই একই ছবির পুনরাবৃত্তি ঘটে জেলাজুড়ে। যদিও হাতেগোনা কিছু পঞ্চায়েত বিজেপি দখল করেছিল। তবে গেরুয়া শিবিরের দাবি, সন্ত্রাস না হলে অধিকাংশ বোর্ডই তাদের হাতে আসত।
এখন বড় প্রশ্ন হল, ২০২৮-এর পঞ্চায়েত বা আগামী বছরের পুরভোটে পর্যন্ত কি অপেক্ষা করবে বিজেপি? নাকি তার আগেই বোর্ড ভেঙে দেবে? বিজেপি সূত্রের দাবি, অসাংবিধানিক কোনো পথে তারা হাঁটবে না। তবে রাজ্য সরকারে বিজেপি এবং নিচুতলার প্রশাসনে তৃণমূল থাকলে উন্নয়ন ও নাগরিক পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এই প্রশাসনিক ভারসাম্যহীনতা কাটাতে দ্রুত ভোটের পথে হাঁটার জল্পনা তুঙ্গে। বিজেপি জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘মন্ত্রিসভা গঠন হলেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এতেও অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। নির্দিষ্ট পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কি বোর্ড ভেঙে দেওয়া সম্ভব? প্রশাসনের এক কর্তা জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার চাইলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে পুর বা পঞ্চায়েত বোর্ড ভেঙে দিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে ছ’মাসের মধ্যে নির্বাচন করানো বাধ্যতামূলক। বিধানসভায় বিশেষ প্রস্তাব এনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পুর প্রশাসনের মেয়াদ শেষ করা যেতে পারে এবং অন্তর্বর্তী সময় পর্যন্ত প্রশাসক বসানো সম্ভব। যদিও এনিয়ে পালটা তৃণমূলের জেলা সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, গায়ের জোরে দখল করতে চাইলে ইতিহাস নিজেদের পুনরাবৃত্তি করবে।