• অস্তাচলে আধিপত্য! এবার সিন্ডিকেটরাজের অবসান? জেলায় পালাবদলের হাওয়ায় ঘুম উড়েছে অনেকের
    বর্তমান | ০৮ মে ২০২৬
  • পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। আর তার সঙ্গেই বীরভূমের চিরাচরিত ‘দাদাগিরি’ আর ‘তোলাবাজি’র সমান্তরাল সাম্রাজ্যে এখন মহাপ্রলয়ের সংকেত। উত্তর থেকে দক্ষিণ, গোটা বাংলার বালি আর পাথরের খিদে মেটানো এই জেলা আসলে এক রত্নগর্ভা সিন্দুক। যার চাবিকাঠি এতদিন ছিল ঘাসফুল শিবিরের কিছু নেতার হাতে। অজয়-ময়ূরাক্ষীর বুক চিরে বালি চুরি আর মহম্মদবাজার-রামপুরহাটের পাহাড় খুঁড়ে পাথর লুটের এই যুগলবন্দি বীরভূমকে বানিয়েছিল এক অবাধ ‘দস্যুবৃত্তি’র স্বর্গরাজ্য। অভিযোগ, এতদিন শাসকদলের দাপটে প্রশাসনের আধিকারিকদের একাংশ ও পুলিশের প্রশ্রয়ে এই কারবার চলছিল। কিন্তু ক্ষমতার চাকা ঘুরতেই ‘বেতাজ বাদশা’দের চোখে এখন রাজপাট হারানোর আতঙ্ক।

    বিজেপি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বারবার এই লুটের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে। এবারের নির্বাচনী প্রচারে এসে খোদ প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীরভূমের মাটিতে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিয়েছিলেন-‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার এলেই এই মাফিয়ারাজ খতম করা হবে। আজ সেই দিন সমাগত। বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই সিউড়ি থেকে রামপুরহাট, সর্বত্রই এখন ফিসফাস, তবে কি এবার মাফিয়াদের ‘হিসাব’ বুঝে নেওয়ার দিন এল? এতদিন যাঁরা দম্ভের পাহাড়ে চড়ে জেলা শাসন করেছেন আজ তাঁদেরই অনেকের ‘পুরনো ফাইল’ খোঁজাখুঁজি শুরু হয়েছে বলেও গোয়েন্দা সূত্রের খবর।

    অজয়, ময়ূরাক্ষী আর ব্রাহ্মণী যেন বালি নয়, বয়ে নিয়ে যায় ‘তরল সোনা’। এছাড়াও সিদ্ধেশ্বরী, দ্বারকা সহ একাধিক নদী থেকে চলে দেদার বালি লুট। ইলামবাজারের অজয় নদ থেকে জয়দেব-কেন্দুলি, কিংবা সাঁইথিয়া- জেলার বালিঘাটগুলি এতদিন সামলাতেন বোলপুরের এক দাপুটে নেতা। তাঁর ছত্রছায়ায় ব্লক ও পঞ্চায়েত স্তরের চুনোপুঁটিরাও ফুলেফেঁপে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’হয়ে উঠেছিলেন। নানুরের সিন্ডিকেট চলত জেলা পরিষদের এক পদাধিকারীর ‘ছায়াসঙ্গী’দের ইশারায়। এই বালির দখল নিতে গিয়ে কতবার জেলার মাটি রক্তাক্ত হয়েছে তার হিসাব নেই। এখন সেই আধিপত্য হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় ঘুম উড়েছে ‘বালি-সম্রাট’দের।

    অবৈধ পাথরের কারবারের সাম্রাজ্যের এক অঘোষিত বাদশার উত্থান হয়েছিল খোদ শাসকদলের এক দাপুটে জেলা নেতার হাত ধরে। মহম্মদবাজার থেকে রামপুরহাট, গোটা এলাকায় শতাধিক অবৈধ ক্র্যাশার আর খাদান চলত তাঁর অঙ্গুলিহেলনে। ডিসিআরের আড়ালে প্রশাসনের পকেটে মাসোহারা গুঁজে রাতারাতি অট্টালিকা বানিয়েছেন বহু পাতি-নেতা। শুধু বালি-পাথর নয়, কয়লা আর গরু পাচারের করিডর হিসেবে বীরভূমকে ব্যবহার করে সিন্ডিকেটও ফুলেফেঁপে উঠেছিল।

    সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সত্যিই কি এই সিন্ডিকেটরাজ শেষ হবে? নাকি যেমন চলছিল তেমনই চলবে? রাজনীতির বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ‘ক্ষমতার পালাবদল মানে অনেক সময় শুধুই চেয়ার বদল।’ অর্থাৎ, এতদিন যারা লুটেছে তাদের সরিয়ে জায়গা নেবে নতুন ক্ষমতাবানদের সাঙ্গপাঙ্গরা। বিজেপিরই এক পুরনো নেতা আড়ালে বলছেন, ‘অবৈধ পাথরের ব্যবসা চালাতে গিয়ে শুধু শাসকদলকে নয়, বিরোধীদেরও তুষ্ট রাখতে হত।’ এব্যাপারে বিজেপির জেলা সহ সভাপতি দীপক দাস বলেন, বীরভূমে এবার আইনের শাসন হবে, কোনো সিন্ডিকেট-সংস্কৃতি বরদাস্ত করা হবে না। তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সহ সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, সবকিছু আইনমাফিক হওয়া উচিত।   

    বীরভূম কি সত্যিই সিন্ডিকেটের অভিশাপমুক্ত হবে, নাকি পালাবদলের এই নাটকে কেবল ‘মালিকানা’র হাতবদল হয়ে লুণ্ঠনের উৎসবটাই বজায় থাকবে? উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে জেলা।
  • Link to this news (বর্তমান)