শ্রীকান্ত পড়্যা, চণ্ডীপুর: শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডে তৃণমূলকেই কাঠগড়ায় তুললেন তাঁর মা হাসিরানি রথ। বৃহস্পতিবার তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, ‘আমার ছেলেকে সুপারি কিলার দিয়ে খুন করা হয়েছে।’ বুধবার সন্ধ্যায় উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান চন্দ্রনাথ। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে বিজেপি নেতারাও নিশানা করেছিলেন তৃণমূলকেই। তাঁদের অভিযোগকেই কার্যত মান্যতা দিলেন হাসিরানিদেবী।
চণ্ডীপুর ব্লকের ঈশ্বরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন কুলুপ গ্রামে চন্দ্রনাথের বাড়ি। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের এই প্রাক্তনী মাত্র ১৮ বছর বয়সে বায়ুসেনায় যোগদান করেন। ১৫ বছর আগে স্বেচ্ছাবসর নেওয়ার পর তিনি শুভেন্দুবাবুর ঘনিষ্ঠ হন। পরে তাঁর আপ্ত সহায়ক হন। এবছর বিধানসভা ভোটে তিনি ভবানীপুর, নন্দীগ্রাম এবং চণ্ডীপুর বিধানসভায় গুরুদায়িত্ব সামলেছেন। আর এটাই তাঁর মৃত্যুর কারণ বলে চন্দ্রনাথের মা হাসিরানির অভিযোগ। এদিন চন্দ্রনাথের মৃতদেহ বাড়িতে আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘ভবানীপুর, নন্দীগ্রাম ও চণ্ডীপুরের ভোটের দায়িত্বে ছিল আমার ছেলে। সম্ভবত সেই কারণে তৃণমূলের লোকজন ছেলেকে টার্গেট করেছিল। প্রচার পর্বে ওরা বলেছিল, ৪ তারিখের পর দিল্লির কোনও বাপ রক্ষা করতে পারবে না। ওরা সেটাই করে দেখিয়ে দিল। রাজ্যের নতুন সরকারের কাছে আমার দাবি, ছেলের খুনিদের যেন শাস্তি হয়। একজন মা হিসেবে ওদের ফাঁসি নয়, বরং যাবজ্জীবন সাজা দাবি করছি।’
চণ্ডীপুর বাজার থেকে ছ’কিমি দূরে কুলুপ গ্রাম। বুধবার রাত বাড়িতে চন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই প্রতিবেশীদের ভিড় জমতে শুরু করে। এদিন সকাল থেকেই সেই ভিড় আরও বাড়ে। গ্রামের ভালো ছেলেকে হারিয়ে সবাই ছিলেন শোকার্ত। বিছানায় শুয়ে হাসিরানিদেবী শুধু কেঁদেই চলেছেন। চণ্ডীপুরের জয়ী বিজেপি প্রার্থী পীযূষকান্তি দাস সান্ত্বনা দিয়ে পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছিলেন। বাড়ির সামনে একটি খোলা মাঠ। সেখানে চন্দ্রনাথকে শেষ বিদায় জানানোর প্রস্তুতি চলছিল। সেখানে উপস্থিত নেতা-কর্মী থেকে স্থানীয় মানুষজনের একটাই প্রশ্ন, শুভেন্দুবাবুর আপ্ত সহায়ককে খুনের কারণ কী? নেপথ্যে কারা? পীযূষবাবু বলেন, ‘এই হত্যা মানতে পারছি না। আমরা দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করছি। আপাতত রাজ্য পুলিশের উপর ভরসা রাখছি।’
বুধবার নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর ধন্যবাদ জ্ঞাপন কর্মসূচি ছিল। সঙ্গে ছিলেন চন্দ্রনাথ। সেখান থেকে চণ্ডীপুরে যান তিনি। তাঁকে বিজেপির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সাংগঠনিক বৈঠকেও যোগ দেন। বৈঠকে চন্দ্রনাথ তৃণমূল নেতাদের বাড়ি কিংবা পার্টি অফিসে হামলা না করার আবেদন করেছিলেন। বিকেলের পর চণ্ডীপুর থেকে মধ্যমগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন।
চন্দ্রনাথের পরিবার একসময় তৃণমূল করত। হাসিরানিদেবী একাধিক বার পঞ্চায়েত সমিতিতে জয়ী হন। একবার কর্মাধ্যক্ষও হন। শুভেন্দু অধিকারীর সান্নিধ্যে আসার পর গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর আপ্ত সহায়ক হিসেবে কাজ করছিলেন চন্দ্রনাথ। ২০২০ সালে ডিসেম্বর মাসে শুভেন্দুবাবু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার পর ওই পরিবারও তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে।
চন্দ্রনাথের বাবা কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। গ্রামের বাড়িতে সেভাবে আসতেন না। ওই গ্রামে শিব চতুদর্শী মূল উৎসব। সেই সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। সেই উৎসবে প্রতি বছর আসতেন চন্দ্রনাথ। কুলুপ গ্রামের বাসিন্দা মহেশ মাহাত বলেন, ‘অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন চন্দ্রনাথ। ওঁর কোনো শত্রু থাকতে পারে, তা বিশ্বাস করতে পারছি না! দোষীদের অবিলম্বে খুঁজে বার করে শাস্তি দেওয়া হোক।’