শুভেন্দু-সঙ্গী খুনে ৭ দিনের প্ল্যান, নেপথ্যে ভিনরাজ্যের শার্প শ্যুটার, ব্যবহৃত ভুয়ো নম্বর প্লেট
বর্তমান | ০৮ মে ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা, বারাসত, শিলিগুড়ি, আসানসোল ও সংবাদদাতা, বাগডোগরা: ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১০টা ৬। বুধবার। মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে মুজিবর রহমান রোড ধরে দোহারিয়ার দিকে যাচ্ছিল রুপোলি রঙের একটি ছোটো গাড়ি। বৃষ্টি কমে এসেছে। রাস্তায় ভিড়ও বেশ কম। পিছনে এগচ্ছে দুটি বাইক। কিছুক্ষণ পর ওই রাস্তাতেই আসে চন্দ্রনাথ রথের সাদা স্করপিও। ততক্ষণে আগের গাড়িটি অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। রাত ১০টা ৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ড—সিসি ক্যামেরায় দেখা গেল আলোর ঝলকানি। আর এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাইক নিয়ে ঝড়ের গতিতে যশোর রোডের দিকে বেরিয়ে যায় হেলমেট পরা দুই যুবক।
মাত্র ৪৫ সেকেন্ডের নিখুঁত অপারেশন! গাড়ির কাচের উপর বন্দুক রেখে, একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে একের পর এক গুলি চালানো হয়। তাতেই ঝাঁজরা হয়ে যান নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের জয়ী বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ। এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার এসটিএফ, সিআইডি এবং আইবি অফিসারদের নিয়ে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। ঠিক যে কায়দায় আততায়ীরা হামলা চালিয়েছে, তাতে এটিকে ‘প্ল্যানড মার্ডার’ বলেই মনে করছে পুলিশ। একেবারে ঠান্ডা মাথায় রেইকি করে খুন। অন্তত সাত দিন ধরে এই ‘মার্ডার প্ল্যান’ করা হয়েছে বলেই প্রাথমিকভাবে সন্দেহ তদন্তকারীদের। সিট-এর অনুমান, চন্দ্রনাথের গতিবিধির খবর ফাঁস করছিল ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তিই। বুধবার অন্তত ৬ ঘণ্টা আগে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে বিরাটি ঘুরে বারাসত এলাকায় ঢোকে রুপোলি গাড়িটি। ঘটনার ১০ মিনিট আগে সেটি পৌঁছায় দোহারিয়া এলাকায়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে বিগত পাঁচ দিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় চন্দ্রনাথকে অনুসরণ করতে দেখা গিয়েছে নির্দিষ্ট কিছু গাড়িকে। তদন্তে জানা গিয়েছে, ভিনরাজ্য থেকে আনা হয়েছিল দুই ‘শার্প শ্যুটার’কে। তাদেরই একজন গুলি চালিয়েছে। সেই ‘সুপারি কিলার’দের এখানে নিয়ে এসেছিল স্থানীয় এক দুষ্কৃতী। সেই থাকার ও গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়। তাদের পিছনে ৩০-৪০ লাখ খরচ করা হয়। ভোরবেলা বিমানে দুজনে শহর ছেড়েছে বলেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অনুমান পুলিশের। বিভিন্ন ফোনকলের সূত্র ধরে জানা যায় ভিনরাজ্যের দুষ্কৃতীদের নামও। তাদের খোঁজে গিয়েছে তদন্তকারীদের একটি টিম। মহিলাঘটিত বিষয় নিয়েও তত্ত্বতালাশ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থলে যান পুলিশের শীর্যকর্তারা। তদন্তে নামে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ দল ও সিআইডি। গুলির খোল উদ্ধার হয়েছে। সংগ্রহ করা হয়েছে একাধিক নমুনাও।
খুনে ব্যবহৃত রুপোলি গাড়ি এবং বাইকটি ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, গাড়িটি একটি সেকেন্ড হ্যান্ড সামগ্রী বিক্রির সাইট থেকে কেনা হয়েছিল। তারপর বারাসতের একটি গ্যারাজে সেটির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর মুছে দেওয়া হয়। বিক্রির জন্য ওয়েবসাইটে থাকা অন্য একটি চারচাকার নম্বরপ্লেটও নকল করে লাগানো হয় তাতে। সেটির মালিক শিলিগুড়ির বাসিন্দা। উদ্ধার হওয়া বাইকটির নম্বর ২০১২’তে আসানসোল শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দা বিভাস ভট্টাচার্যের নামে নথিভুক্ত। তাঁর ঠিকানা হীরাপুর থানার ইসকো এবি টাইপ কোয়ার্টার। সেখানে গিয়ে অবশ্য পুলিশ পেয়েছে ধর্মবীর কুমার নামে এক ইসকো কর্মীকে। তিনি ২০১৪ থেকে ওখানে থাকছেন। বিভাস নামে কাউকে চেনেন না।
এদিন দুপুর ৩টে নাগাদ বারাসত মেডিকেল কলেজে ময়নাতদন্ত শেষে চন্দ্রনাথের দেহ নিয়ে যাওয়া হয় চণ্ডীপুরের বাড়িতে। রাতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মেডিকেল কলেজের এমএসভিপি অভিজিৎ সাহা বলেন, ‘তিন সদস্যের মেডিকেল কমিটি গড়ে ময়নাতদন্ত হয়েছে চন্দ্রনাথ রথের। মৃতদেহের এক্স-রে করা হয়েছে। তাতে দেহের ভেতরে পাঁচটি বুলেট দেখা গিয়েছে। চন্দ্রনাথবাবুর বাম হাত, পাঁজরে এবং পেটে গুলি লেগেছিল।’ এটা যে পরিকল্পিত খুন, সেব্যাপারে কার্যত নিশ্চিত স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি বলেন, ‘আমি ভবানীপুরে না জিতলে হয়তো চন্দ্রনাথকে টার্গেট করা হত না। ডিজিপি আমাকে বলেছেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ ক্লু পেয়েছে। দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করা হবে। আমরা ওর পরিবারের পাশে আছি। আহত চালকের চিকিৎসার দায়িত্বও আমাদের।’