মণিপুষ্পক সেনগুপ্ত
চন্দ্রর হোয়াটসঅ্যাপ থেকে আর কোনও টেক্সট আসবে না। ফোন করলে অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসবে না সেই চেনা গলা —'হ্যাঁ দাদা, বলো।'
চন্দ্রর উপরে কার এত রাগ থাকতে পারে! কীসের এত রাগ! এ ভাবে খুন করতে হলো ছেলেটাকে! খুনের কারণ এবং আততায়ীদের নিশ্চয়ই পুলিশ খুঁজে বের করবে। কিন্তু আমার মতো আরও অনেক সাংবাদিকের বহু গল্প বাকি ছিল চন্দ্রর সঙ্গে। সে সব আর হবে না। ঠোঁটের ডগায় অকৃত্রিম হাসিটা ছুঁয়ে বিধানসভার লবিতে দাঁড়িয়ে চন্দ্র আর ফিসফিস করে বলবে না — 'একটা সিগারেট দাও তো।'
চন্দ্রনাথ রথ। বুধবার রাতের পরে তাঁর নাম বাংলার সবাই জেনে গিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক। ২০২১ থেকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতার ব্যাক অফিস সে–ই সামলাত। আমার সঙ্গে চন্দ্রর পরিচয় তখন থেকে।
বুধবার রাতে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা ওকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। খবরটা শোনার পরে প্রথমে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারিনি। ঘণ্টাখানেক আগেই তো ফোন করলাম চন্দ্রকে। ধরেনি। ইদানীং তুমুল ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ফোন তুলতে পারত না। বুঝতাম। কিন্তু শুভেন্দুর রাজনৈতিক কর্মসূচি জানার জন্য চন্দ্রর মোবাইল নম্বর ডায়াল করতে হতো যখন–তখন। ফোনে খুবই কেজো কথা হলেও ভালো লাগত, কারণ চন্দ্রর কথা বলার স্টাইলে ছিল ভরপুর আত্মবিশ্বাস।
বছর খানেক আগের কথা হবে। নিজাম প্যালেসে বিধানসভা বিটের সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ করেছেন শুভেন্দু। ডিনারের সঙ্গে খোলামেলা আড্ডা। তার দিন কয়েক আগে চন্দ্রর ফোন—'দাদা আসতেই হবে কিন্তু।' সে দিন সন্ধ্যায় শুরু চন্দ্রর তাগাদা, 'কখন আসছ দাদা? একদিন কম খবর লিখলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। তাড়াতাড়ি চলে এসো।'
সেই সময়ে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার ঘরে আন্তর্জাতিক থেকে রাজ্য রাজনীতি নিয়ে চন্দ্রর 'গলাবাজি' ছিল দেখার মতো। তুমুল চিৎকার করে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করত ঘরোয়া আড্ডাগুলিতে। বিধানসভার ফ্লোরে এত চিৎকার করতে পারতেন না কোনও বিধায়কও। চন্দ্রকে না চিনলে মনে হতেই পারে, প্রচণ্ড রেগে গিয়েছে সে। আসলে তা নয়। ঝগড়া মিটতেই জুতো–মোজা খুলে সোফায় পা তুলে আড়মোড়া ভাঙত শুভেন্দুর আপ্ত সহায়ক। তারপর একগাল হেসে বলত, 'চা খাই চলো।'
বুধবার সন্ধ্যায় চন্দ্রকে ফোনে না পেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছিলাম, 'ফাঁকা হলে একটা ফোন কোরো।' তখন কী জানতাম, চন্দ্রকে আর কখনও ফাঁকা পাব না!