আশিস নন্দী, মধ্যমগ্রাম
সোমনাথ মণ্ডল, কলকাতা
বুধবার রাতে বাড়ি ফেরার সময়ে শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ কালো কাচে ঢাকা গাড়ির ঠিক কোথায় বসেছিলেন, সেই 'ইনপুট'–ও চলে এসেছিল শার্প শুটারদের কাছে! সে কারণেই মধ্যমগ্রামের ব্যস্ত রাস্তায় চন্দ্রকে গুলিতে ঝাঁঝরা করতে মাত্র ৪৫ সেকেন্ড সময় লেগেছিল আততায়ীদের। পুলিশ জানতে পেরেছে, খুনের 'কাজে' রুপোলি রঙের একটি গাড়ি ছাড়াও ব্যবহার হয়েছিল লাল রঙের দ্বিতীয় একটি গাড়ি। অপারেশন শেষ করে ওই লাল গাড়ি এবং একটি বাইকে চেপে পালিয়ে যায় শুটাররা। ঘটনার দু'দিন পরে পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট)–এর তদন্তে এই তথ্য উঠে এসেছে।
চন্দ্র-খুনের দুষ্কৃতীরা যে বাইরের রাজ্য থেকেই এসেছিল, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা নিশ্চিত। তবে, এই অপারেশনে স্থানীয় দুষ্কৃতীদেরও সাহায্য নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। তিন জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, দুষ্কৃতী দলে কমপক্ষে আট জন ছিল। তাদের ব্যবহৃত একটি বাইক শুক্রবার সকালে বারাসতের ১১ নম্বর রেলগেট সংলগ্ন রাস্তায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। কে বা কারা এই খুনের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত, তা জানতে সিটের তদন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিআইডি–র ডিআইজি (সাইবার ক্রাইম) অজয়কুমার ঠাকুর। টিমে আছেন বারাসতের পুলিশ সুপার পুষ্পা–সহ সাত জন। দু'টি টিমকে উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারে পাঠানো হয়েছে। সূত্রের খবর, ওই সব রাজ্য থেকে শুটারদের আনা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের অনুমান।
প্রাক্তন বায়ুসেনা-কর্মী চন্দ্রনাথকে খুনের হুমকি আগেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনে জেতার পরে তাঁর আপ্ত সহায়ককে এ ভাবে 'সরিয়ে দেওয়া' হবে, তা হয়তো তিনি নিজেও বুঝে উঠতে পারেননি। শার্প শুটারদের এত নিখুঁত পরিকল্পনাও অবাক করেছে তদন্তকারীদের। তাঁরা খতিয়ে দেখছেন, বুধবার রাতে গাড়িতে চেপে বাড়ি ফেরার সময়ে চন্দ্রনাথ কোন সিটে বসে ছিলেন, সেই তথ্য কে বা কারা শার্প শুটারদের দিয়েছিল? চন্দ্রনাথের গাড়িতে কালো কাচ ছিল।
ফলে অপরিচিতদের পক্ষে হঠাৎ করে বোঝা সম্ভব নয় যে তিনি কোথায় বসে আছেন। কিন্তু দুষ্কৃতীরা ঠিক জানত, সামনে চালকের বাঁ পাশে বসে শুভেন্দুর আপ্ত সহায়ক! সে কারণে সামনে থেকে গাড়ি আটকে দেওয়ার পরে বাঁ দিক থেকে 'পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ' থেকে পর পর গুলি চালানো হয়। পরে চন্দ্রনাথের শরীর থেকে পাঁচটি বুলেট পাওয়া যায়। গাড়ির চালক বুদ্ধদেব বেরার শরীর থেকে পাওয়া গিয়েছে তিনটি বুলেট। 'মোডাস অপারেন্ডি' দেখে এর নেপথ্যে জেলবন্দি পেশাদার খুনিরা যুক্ত রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বাংলার পাশাপাশি ভিন রাজ্যের জেলেও বন্দিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ওডিশায় জেলবন্দি সুবোধ সিংহের কাছে গিয়ে কথাবার্তা বলেন তদন্তকারীরা।
মধ্যমগ্রাম চৌমাথার কাছে দোহারিয়া এলাকায় চন্দ্রনাথের গাড়ি আটকায় রুপোলি রঙের একটি গাড়ি। বুধবার রাতে ওই গাড়িটি ছাড়াও একটি বাইক উদ্ধার হয়। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখার পরে জানা যায়, চন্দ্রনাথের গাড়ির পিছনে ছিল আরও একটি লাল গাড়ি। ঘটনার পরে সম্ভবত ওই গাড়িতেই পালায় দুষ্কৃতীরা। শুক্রবার বারাসতের ১১ নম্বর রেলগেট সংলগ্ন রাস্তা থেকে আরও একটি বাইক উদ্ধার হয়। পালিয়ে যাওয়ার সময়ে বাইকটি ওখানে রেখে যায় দুষ্কৃতীরা। অপরাধে ব্যবহৃত লাল গাড়ি ও বাইকটি আগেই চুরি করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক অনুমান পুলিশের। তদন্তকারীদের দাবি, গোটা অপারেশনে আট জন দুষ্কৃতী ছিল। ঘটনাস্থলের ঠিক উল্টোদিকের একটি বহুতলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে দেখা গিয়েছে, রুপোলি গাড়ির পিছনে রাত ১০ টা বেজে ২৬ সেকেন্ডে আরও একটি লাল গাড়ি ঢুকেছিল। খুনের পরে একটি বাইকে দু'জনকে যশোহর রোডের দিকে যেতেও দেখা যায়।
গাড়ির নম্বর প্লেট থেকে সহজেই জানা সম্ভব, গাড়িটি কোথা থেকে কেনা হয়েছে অথবা মালিক কে? ওই নম্বরে কারচুপি করা হলে, শ্যাসিজ় নম্বর থেকেও গাড়ির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যেতে পারে। রুপোলি গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করার পরে দেখা যায়, নম্বরটি ভুয়ো। এমনকী, শ্যাসিজ় নম্বরটি (প্রচলিত কথায় চেসিজ় নম্বর) ঘষে তুলে দেওয়া হয়েছে! ওই গাড়ির আসল মালিক শিলিগুড়ির মাটিগাড়ার ব্যবসায়ী জোসেফ উইলিয়াম। স্থানীয় আরটিও অফিস থেকে রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল গাড়ির। কিছুদিন আগে অনলাইনে গাড়িটি বিক্রি করার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। সূত্রের খবর, উত্তরপ্রদেশের এক ব্যক্তি গাড়িটি কেনার জন্য জোসেফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কে ওই গাড়িটি কিনেছিলেন, তা জানার জন্য আসল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন অফিসারেরা। তদন্তকারীরা নিশ্চিত, নিজেদের পরিচয় গোপন করতেই এতটা নিখুঁত পরিকল্পনা করেছিল আততায়ীরা।