সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
৮ মে ২০২৬। সন্ধে নামার আগেই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম জানল বাংলা। ২০২০–তে মেদিনীপুর কলেজ মাঠ থেকে যে অমিত শাহের হাত থেকে পতাকা নিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, সেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করলেন শুক্রবার।
কংগ্রেস, তৃণমূল থেকে বিজেপি। কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলার, চেয়ারম্যান, বিধায়ক, সাংসদ, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী — সফর আদৌ মসৃণ ছিল না। শিশির-পুত্র থেকে শুভেন্দু অধিকারী হয়ে ওঠার পিছনে চূড়ান্ত জিদ, অধ্যাবসায় এবং ঝুঁকিও ছিল।
২০০৭–এ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির গণ আন্দোলন এবং ২০১১–য় ঝাড়গ্রামের নেতাই গণহত্যার পর থেকে বাবা শিশির অধিকারীর ছায়া ছেড়ে শুভেন্দু নামেই নিজের পরিচিতি তৈরি হয়েছিল তাঁর। সামান্য রক্তদান শিবির থেকে পুজোর উদ্বোধন — দুই মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের প্রতিটি এলাকায় দৌড়ে বেড়িয়েছেন।
জঙ্গলমহলে ঝুঁকিপূর্ণ মাওবাদী এলাকায় পৌঁছে যেতেন অবলীলায়। বহু ক্ষেত্রেই রাস্তায় ল্যান্ডমাইন পোঁতা রয়েছে জানিয়ে পুলিশ আটকানোর চেষ্টা করত। কিন্তু নাছোড় শুভেন্দু অপেক্ষা করতেন। মাইন সরানোর পরে ঝুঁকি নিয়েই যেতেন ঝাড়গ্রাম, লালগড়ে। আবার ফেরার পথে মাওবাদী মুক্ত এলাকায় সিপিএমও তাঁর পথ রোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে বহুবার। কিন্তু তাঁকে থামানো যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে সভা সমাবেশে যাওয়ার পথে হঠাৎ রাস্তা পরিবর্তন করে দিত পুলিশ। যা নিয়ে তৈরি হতো নানা আশঙ্কা। তবু শুভেন্দু সভাস্থলে যেতেন। সভা শেষে অপেক্ষা করতেন। কর্মী-সমর্থকরা নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরার খবর পাওয়ার পরে রওনা দিতেন। তৃণমূলের জমানায় এ ভাবে তিলে তিলে জঙ্গলমহলে যে সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, তার অনেকটাই পরে তাঁর সঙ্গেই বিজেপি–তে চলে এসেছিল।
প্রতিটি নেতা, কর্মীর খোঁজ রাখতেন। সমস্যায় পাশে দাঁড়াতেন। কর্মী-সমর্থকরা আক্রান্ত হলে হাসপাতালে পাঠানো থেকে চিকিৎসার খরচও পৌঁছে দিতেন। অর্থাভাবে কোনও কর্মী-সমর্থকের মেয়ের বিয়ে দিতে সমস্যা হচ্ছে শুনলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। ২০১১–র নির্বাচনে জনসাধারণ কমিটির নেতা ছত্রধর মাহাতোকে টিকিট দিতে রাজি হয়নি তৃণমূল। পরিবর্তে টিকিট দিয়েছিল সুকুমার হাঁসদাকে। কিন্তু নাছোড় ছত্রধর ঝাড়গ্রামেই দাঁড়িয়েছিলেন। শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ নেতা রমাপ্রসাদ গিরি বলছেন, 'তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, তা হলে কি ছত্রধরও বিধানসভায় যাবে? শিশির অধিকারী ও শুভেন্দু অধিকারী আশ্বস্ত করেছিলেন, তা হবে না। সুকুমার জিতবে। সেটাই হয়েছিল।'
২০২০–তে শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর অনুগামীদের একটা বড় অংশ বিজেপিতে চলে যান। কিছু নিষ্ক্রিয়ও হয়ে যান। অনেক তৃণমূল নেতাও স্বীকার করছেন, 'যাঁরা তৃণমূলে রয়ে গিয়েছিলেন, তলে তলে তাঁদের অনেকেই শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেন।'