• ভরসা যেন না ভাঙে, আগামীর স্পষ্ট বার্তা শাহের
    এই সময় | ০৯ মে ২০২৬
  • এই সময়: একটাই নাম শুভেন্দু অধিকারী! শুক্রবার বিজেপির জয়ী বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে কার্যত এই বার্তাই দিলে‍ন কেন্দ্রীয় সরকারের সেকেন্ড–ইন–কম্যান্ড তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা বাছতে এ দিন নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিধানসভা ভোটে বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শাহ। সেখানে সর্বসমক্ষে তিনি জানতে চান, কাকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার দেওয়া যেতে পারে? সভাস্থলে হাজির ২০৬ জন বিধায়ক (শুভেন্দু অধিকারী ছাড়া) একসুরে একটা নামই উচ্চারণ করেন— শুভেন্দু!

    এই নামেই যে জয়ধ্বনি উঠবে, বিলক্ষণ জানতেন শাহ। তাঁর মুখে তখন স্মিত হাসি। তার থেকেও ইঙ্গিতবাহী হলো এ দিনের বৈঠকে বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর নাম প্রস্তাব করেন খড়্গপুর সদরের বিধায়ক তথা রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ। মঞ্চে তখন বসে কেন্দ্রীয় সহ–পর্যবেক্ষক, ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় নেতা সুনীল বনসলরা।

    সভার এই সুর স্পষ্ট করে দেয়, নরেন্দ্র মোদী–অমিত শাহদের প্রতিশ্রুতিমতো ‘সোনার বাংলা’ গড়তে ঐক্যবদ্ধ হয়েই কাজ করবে বঙ্গ–বিজেপি। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বছর দেড়েক আগে বঙ্গ–বিজেপির সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার সময়েই শমীক বলেছিলেন, একজোট হয়ে বাংলা থেকে তৃণমূলকে উৎখাত করতে হবে। ফলে এ দিনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচনের সভা সবদিক থেকেই এক অদ্ভুত সমাপতন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

    সমস্বরে শুভেন্দুর নাম শোনার পরে শাহ বলেন, ‘পরিষদীয় নেতা বাছাইয়ের জন্য বিধায়কদের থেকে নামের প্রস্তাব ও সমর্থন চাওয়া হয়েছিল। একটা নয়, দ্বিতীয় নামও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় কোনও নাম আসেনি। সব প্রস্তাব আর সমর্থন একটা নামের পক্ষেই গিয়েছে— শুভেন্দু অধিকারী।’ তাঁর সংযোজন, ‘বাংলার ভাবী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীই। বাংলার মানুষকে কোটি কোটি ধন্যবাদ। বাম আমলের থেকেও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভয় গিয়েছে। ভরসা এসেছে।’

    কিন্তু কী ভাবে চলবে নতুন সরকার? কোন লক্ষ্যে কাজ করবেন শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা?

    এই সভায় শাহ বলেন, ‘বাংলার মানুষের বিশ্বাস পূরণ করতে বদ্ধপরিকর বিজেপি। কথা কম, কাজ বেশি করবে আমাদের সরকার।’ তাঁর সংযোজন, ‘মমতাজির শাসনে এখানে ভয়ের আবহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যেও আমাদের নেতাদের উপরে ভরসা রেখে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আমাদের যে বিজয় উপহার দিয়েছেন, তার জন্য তাঁদের কোটি কোটি ধন্যবাদ। আমি আমাদের নেতাদের বলতে চাই, যে আশা আপনাদের উপরে জনতা রেখেছে, সেগুলি পূরণ করার সম্পূর্ণ চেষ্টা আপনারা করবেন।’ আগামীর পথে চলার আগে তাঁর সতর্কবার্তা, ‘মানুষের বিশ্বাস যেন ভঙ্গ না হয়, আমাদের নেতাদের এটাই কর্তব্য। বাংলার মানুষকে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠটুকু আমরা উজাড় করে দেবো, এটা নিশ্চিত করতে হবে।’

    বাংলায় যে এ বার পদ্মের সরকারই হচ্ছে, তা ভোট প্রচারে এসে বারবার দাবি করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী–অমিত শাহরা। সেই স্বপ্ন সফল হলো কোন পথে, এ দিন তারও ব্যাখ্যা দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শাহের কথায়, ‘গত বার ৭৭টি আসন মিলেছিল। কিন্তু এ বার যা আসন মিলেছে, তাতে বিজেপি কার্যকর্তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমাদের বিধায়কদের জেতার গড় মার্জিন ২৮ হাজার। ২০১৬–তে তিনটি আসন থেকে ২০২১–এ ৭৭টি হয়ে এ বার ২০৭টি আসনের এই যাত্রাপথে এ বারে ২০টি জেলায় বিজেপি–ই এগিয়ে আছে। এবং এই ২০টি জেলার মধ্যে ৯টি জেলায় দিদির দল খাতাই খুলতে পারেনি। তৃণমূল পুরো সাফ হয়ে গিয়েছে।’

    দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাড়ায় শুভেন্দু মনোনয়ন জমা দেওয়ার দিন তাঁর সঙ্গে হাজির হয়েছিলেন শাহ। সেখান থেকেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হবে ভবানীপুর থেকে। তৃণমূলনেত্রীর পাড়ায় শুভেন্দু তাঁকে পরাস্ত করার পরে এ দিন শাহ বলেন, ‘ভবানীপুরের জনতাকে মন থে‌কে ধন্যবাদ, অভিনন্দন জানাচ্ছি। এর আগেও শুভেন্দু নন্দীগ্রামে দিদিকে হারিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে দিদি বলতেন, ওঁদের (অধিকারী গড়ে) এলাকায় লড়েছেন। এ বার তো দিদিকে দিদির এলাকাতেই হারিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু।’

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, পরপর দু’বার মমতাকে পরাস্ত করে ‘জায়ান্ট কিলার’ শুভেন্দু এমনিতেই বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদের নিশ্চিত দাবিদার ছিলেন। সেই দাবিতে এ দিন সরকারি ভাবে সিলমোহর দিলেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি বঙ্গের পদ্ম শিবিরও। এ দিনের সভা থেকে শাহ আগামীর সরকারের জন্য আরও একটি দিশা দিয়েছেন। রাজ্যে ভোট প্রচারে এসে মোদী–শাহরা বারবার তৃণমূলের দুর্নীতি–গুন্ডাগিরি–তোলাবাজি নিয়ে তোপ দাগতেন। বিজেপি সরকার যেন সে পথে না–হাঁটে, সেটাও এ দিন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শাহ। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘ভারতীয় জনতা পার্টির তরফে বঙ্গবাসীকে এই ভরসা দিতে চাই যে, বিজেপির শাসনে প্রশাসনের রাজনীতিকরণ হবে না এবং রাজনীতির অপরাধীকরণ হবে না।’

  • Link to this news (এই সময়)