• স্বামীজির মন্ত্র আউড়ে ‘আমিত্ব’ ভাঙার শপথ, লালবাড়ির অধিকারী শুভেন্দুই
    এই সময় | ০৯ মে ২০২৬
  • মণিপুষ্পক সেনগুপ্ত

    মুখ্যমন্ত্রী পদের ‘আমিত্ব’ ভাঙতে চলেছেন বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর নীতি হবে— ‘আমি নই, আমরা।’ বিজেপির দৃঢ় বিশ্বাস, শুভেন্দুর এই সকলকে নিয়ে চলার নীতিতেই বাংলা ফিরে পাবে তার পুরোনো মর্যাদা। শুভেন্দুর কথায়, ‘একটাই মন্ত্র হবে। স্বামীজির মন্ত্র— চরৈবেতি, চরৈবেতি, চরৈবেতি।’

    শুক্রবার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেখানে হাজির ছিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকা‍ন্ত মজুমদার, কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসলরা। ওই বৈঠকে সর্বসম্মত ভাবে সিদ্ধান্ত হয়, বিজেপির পরিষদীয় দ‍লনেতা তথা বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হবেন ভবানীপুর এবং নন্দীগ্রাম জোড়া কেন্দ্রের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী।

    ২০২১–এ নন্দীগ্রাম থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। সে বার বিজেপি বাংলার মসনদ দখল করতে না পারলেও শুভেন্দুই যে বাং‍লায় বিজেপির ‘মুখ’, সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ২০২৬–এর বিধানসভা ভোটে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড় ভবানীপুরে এসেও তাঁকে হারিয়েছেন শুভেন্দু। এর পরেই একরকম স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী তিনিই হচ্ছেন। শুধু অানুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা। শুক্রবার সেই আনুষ্ঠানিকতাও সেরে ফে‍লা হলো বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে।

    আজ, শনিবার ব্রিগেডে বাং‍লার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন শুভেন্দু অধিকারী। তার আগে এ দিন বাংলার হবু প্রশাসনিক প্রধান স্পষ্ট করলেন, বিজেপি সরকারের ফোকাস। শুভেন্দু বলেন, ‘বাং‍লার ৪৬ শতাংশ মানুষের সমর্থন নিয়ে আমরা ক্ষমতায় এসেছি। সংকল্পপত্রের প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ৬০ শতাংশের বেশি মানুষকে আমাদের পাশে আনব দ্রুত।’ আর সেই লক্ষ্য পূরণে যে ভাষণবাজির বদলে কাজ করতে হবে, সেটা এ দিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, ‘ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার জাগ্রতভূমি এই পশ্চিমবঙ্গকে আমাদের সোনার বাংলায় পরিণত করতে হবে। তাই কথা কম, কাজ বেশি।’ তাঁর সংযোজন, ‘যে গুরুদায়িত্ব আপনারা দিয়েছেন, সেটা পালন করার চেষ্টা করব। এবং আমি নই, আমরা।’

    ঐক্যবদ্ধ ভাবে ‘সোনার বাং‍লা’ গড়ে তোলার উপরে জোর দিতে শুভেন্দু পর পর বেশ কয়েকবার বলেন, ‘আমরা, আমরা, আমরা।’ এবং তার পরই জানান, ‘সর্বোপরি সংগঠন।’ বাংলার সদ্য–প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ ছিল, তিনি সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজের মন্ত্রিসভা এবং দলের কারও মতামতের তোয়াক্কা করেন না। তিনি নিজে যেটা ভালো বোঝেন, সেটাই করেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, মমতার এই ‘আমিত্ব’ই বাংলাকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায়। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার আগে মুখ্যমন্ত্রীর পদের সঙ্গে সেঁটে থাকা সেই ‘আমি’ শব্দটির বদলে ‘আমরা’ জুড়তে চাইছেন হবু মুখ্যমন্ত্রী। এরই পাশাপাশি, সংগঠনের গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছে‍ন, বিজেপির সংগঠন এবং সরকার হাত ধরাধরি করেই ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলবে।

    এ দিন অমিত শাহের সঙ্কল্পের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘চার্জশিট প্রকাশের দিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দু’টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাংলার মানুষকে। সন্দেশখালি থেকে আরজি কর হয়ে যত জায়গায় মা-বোন-কন্যাদের উপরে অত্যাচার করা হয়েছে, তা নিয়ে কমিশন বসবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে।’ সেই সঙ্গে শাহের আরও একটি সঙ্কল্পের কথাও মনে করিয়ে দেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘চার্জশিট প্রকাশের দিন শাহ এও বলেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি যাঁরা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের দিয়ে কমিশন বসানো হবে। সরকারি অর্থ যাঁরা নয়ছয় করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

    ভোট প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা জোর দিয়েছিলেন ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের উপযোগিতার উপরে। তাঁরা বিভিন্ন প্রকল্পের উল্লেখ করে বাংলার মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, সিএম আর পিএম হাতে হাত ধরলে কত সুবিধা হতে পারে। যে সুবিধা পায় উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি। এ প্রসঙ্গেই শুভেন্দু বলেন, ‘মোদীজির মন্ত্র— সব কা সাথ, সব কা বিকাশ, সব কা বিশ্বাস, সব কা প্রয়াস! বাংলাকে মোদীজির আদর্শে নবনির্মাণ করে, কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ ভাবে কাজ করে, মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করি— এটাই হোক আজকের দিনে আমাদের সঙ্কল্প।’

  • Link to this news (এই সময়)