২০২০ সালের সেই হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ, মমতাকে কী লিখেছিলেন শুভেন্দু?
আজ তক | ০৯ মে ২০২৬
সালটা ২০২০, মাসটা অক্টোবর। বিধানসভা নির্বাচনের তখন কয়েকমাস হাতে বাকি। তৃণমূলের অন্দরমহলে সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন তাঁর সেরা ফর্মে। তবে ভিতরে ভিতরে একটা বড় ঝড় উঠছিল। যার আভাস অনেকেই পাননি সে সময়ে। পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূলের সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ ও কিংমেকার এবং নন্দীগ্রামে তৃণমূলের স্তম্ভ শুভেন্দু অধিকারী তখন মমতা শিবিরে ছিলেন। তবে ছিলেন বেশ কিছুটা অস্বস্তিতে।
শুভেন্দু ছিলেন সেই নেতা যিনি ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতায় এনেছিল এবং ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। মমতার কাছে শুধু একজন নেতাই ছিলেন না, বরং পরিবারের একজন সদস্য ছিলেন। তিনি পরিবহণ, সেচ ও জলপথের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্বে ছিলেন। হুগলি নদী সেতু কমিশনেরও সভাপতিত্বে ছিলেন তিনি।
কিন্তু ২০২০ সাল নাগাদ পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব নেন সে সময়ে। এই বিষয়টি শুভেন্দু অধিকারী ভাল ভাবে নেননি। তিনি অভিষেককে তাঁর নেতা হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। দু'জনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বাড়তে থাকে ক্রমশ। ২০২০ সালের অক্টোবরে সংবাদের শিরোনাম হতে থাকে 'অভিষেক ও শুভেন্দুর মনোমালিণ্য'।
শুভেন্দু প্রকাশ্যে অভিষেককে আক্রমণও করতে শুরু করেন। স্বামী বিবেকানন্দের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'আমি, আমার এইসব নীতি দিয়ে কেউ জগৎ পরিবর্তন করতে পারে না। যাঁরা এই ধরনের কথা প্রচার করে, তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করে।' শুভেন্দুর জনসভা গুলি থেকে মমতার ছবি উধাও হতে শুরু করে এবং স্লোগান থেকে 'তৃণমূল' শব্দটিও ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। ২৫ নভেম্বর ২০২০, টানাপোড়েন আরও বাড়তে থাকে।
তৃণমূল ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম হামলার ১৩তম বার্ষিকী পালন করছিল সে সময়ে। তবে শুভেন্দু দলের ব্যানারে সমাবেশ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর শুভেন্দু হুগলি নদী সেতু কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২৭ নভেম্বর তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভা থেকেও পদত্যাগ করেন।
মমতা সে সময়ে তাঁকে রাজি করাতে দূত পাঠান। তাঁরা হলেন প্রশান্ত কিশোর এবং সৌগত রায়। কিন্তু শুভেন্দু অনড়ই থাকেন। তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় এবং দলের তৎকালীন ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর শুভেন্দুকে বোঝাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। সৌগত রায় নিজে তাঁকে বোঝাতে গিয়েছিলেন। সে সময়ে সৌগত রায় বলেন, 'ওঁর পদত্যাহ যথাযথ ছিল না। স্পিকারের কাছে যথাযথ ভাবে পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তিনি দল ছেড়ে দিয়েছেন। ১ ডিসেম্বর তাঁর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে। কিন্তু ২ ডিসেম্বর তিনি হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের জানান আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারবে না। সেদিনই আমরা ঘোষণা করি, আমরা শুভেন্দুর সঙ্গে আর কথা বলব না।'
২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর শুভেন্দু TMC-র প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করে দলটির সঙ্গে তাঁর পথ আলাদা করে নেন। একই দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় TMC-কে গভীর শিকড়যুক্ত একটি বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, 'যদি ২-৩ জন অসন্তুষ্ট দল ছেড়ে যান, তাতে তাঁর দলের কোনও ক্ষতি হবে না।'
একটি জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে মমতা বলেন, 'চম্বলের কিছু দস্যু আর বহিরাগত বাংলায় ঢুকে পড়েছে। কখনও তারা পুলিশকে, কখনও TMC-কে হুমকি দেয়। আজ TMC বটগাছের মতো শক্ত। ২-৩ জন লোক, যারা জানে যে তারা দলের টিকিট পাবে না, তারা দল ছেড়ে চলে যাচ্ছে।'
২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর বিকেলটি নানা দিক থকেই ছিল ঐতিহাসিক। মেদিনীপুরের কলেজ প্রাঙ্গণ জুড়ে গেরুয়া ঢেউ বয়ে গেল। মঞ্চে ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুভেন্দু অধিকারী মঞ্চে এসে শাহের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন এবং গেরুয়া পতাকা হাতে নিয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলা আর অবিচার সহ্য করবে না।
সেখান থেকে শুভেন্দু BJP-র রথচালক হয়ে ওঠেন। এমন একজন যিনি বাংলার ভূগোল এবং ভোটারদের মনের কথা বুঝতেন। ছয় বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, কৌশল, জনসংযোগ এবং সাংগঠনিক সম্প্রসারণের ফলস্বরূপ শুভেন্দু অধিকারী, যাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর বলে মনে করতেন, সেই বাংলারই মুখ্যমন্ত্রী হলেন।