• গাড়ির ভিতরে শুয়েই প্রত্যক্ষ করেছেন চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু, ‘সাক্ষী’ মন্টুর কানে এখনও বাজছে গুলির শব্দ
    বর্তমান | ০৯ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: মাত্র কয়েক সেকেন্ড! তারপরই গুলির শব্দে কেঁপে উঠেছিল গোটা গাড়িটা! চোখের সামনে রক্তাক্ত হয়ে ঢলে পড়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। পিছনের সিটে ঘাপটি মেরে শুয়ে, মৃত্যুকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলা সেই দৃশ্য দেখেছিলেন মন্টু মণ্ডল। ঘটনার পর কেটে গিয়েছে দু’দিনের বেশি। কিন্তু এখনও ঘুমোতে পারছেন না তিনি। তাঁর মনে বারবার ফিরে আসছে সেই অভিশপ্ত রাতের কথা। গাড়ির কাচ ভেদ করে আসা গুলি। রক্তে ভেসে যাওয়া সিট। আততায়ীদের অবিশ্বাস্য ঠান্ডা মাথার ‘অপারেশন’। ফলত, ট্রমা কাটাতেই পারছেন না সাক্ষী মন্টু!

    গত বুধবার রাতে হাড়হিম করা গুলির ঘটনা ঘটে মধ্যমগ্রামের দোহারিয়ায়। নিহত হন চন্দ্রনাথ রথ। ওই দিন কলকাতার নিজাম প্যালেস থেকে ফেরার সময় চন্দ্রনাথের গাড়িতেই ছিলেন বারাসতের বিজয়নগরের বাসিন্দা মন্টু। চন্দ্রনাথের সহযোগী হিসেবেই কাজ করতেন তিনি। গাড়িতে পিছনের সিটে বসেছিলেন তিনি। আর সেই কারণেই খুব কাছ থেকে দেখেছেন গোটা হামলাটা। ইতিমধ্যেই সিআইডি তাঁকে একপ্রস্থ জেরা করেছে বাড়িতে গিয়ে। কী ভাবে হামলা হল, কতজন ছিল, কোন দিক থেকে গুলি চলল— সবিস্তার জানিয়েছেন মিন্টু। তাঁর কথায়, বহুতল আবাসনের দিকে ঢোকার আগে মুজিবর রোড ধরে এগচ্ছিল গাড়ি। তিনি তখন ডান দিকের কাচের বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। আচমকা সামনে এসে দাঁড়ায় একটি চারচাকা গাড়ি। কার্যত পথ আটকে দেওয়া হয়। তারপরেই সব কিছু ঘটে যায় ঝড়ের গতিতে। এক দুষ্কৃতী গাড়ির বাঁদিকে সামনের কাচের সামনে এসে দাঁড়ায়। পরপর গুলি চালাতে শুরু করে। কাচ ভেদ করে গুলি লাগে চন্দ্রনাথের বুক ও মাথায়। একইসঙ্গে চালকের দিক থেকেও গুলি চালানো হয়। মন্টুর দাবি, পুরো ঘটনাটা ঘটেছিল মিনিটেরও কম সময়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি চলতে শুরু করে। আমি সিটের নীচে শুয়ে পড়েছিলাম। শুধু শব্দ শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল, কোনও প্রশিক্ষিত দল অপারেশন চালাচ্ছে। তারপর? চন্দ্রনাথবাবু ততক্ষণে রক্তাক্ত অবস্থায় সিটে ঢলে পড়েছেন। গুলিবিদ্ধ চালক বুদ্ধদেব বেরা কোনওরকমে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন মন্টু। তবু সেই অবস্থাতেই নিজেকে সামলান।তিনি বলছেন, কোনওরকমে চালককে পিছনের সিটে তুলে নিজেই স্টিয়ারিং ধরি। উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনো। পরে যশোর রোডের ধারে একটি নার্সিংহোমের সামনে গাড়ি থামাই। গাড়ির সামনে বিধানসভার স্টিকার দেখে নার্সিংহোমের কর্মীরা দ্রুত আহতদের ভিতরে নিয়ে যান। কিন্তু অভিশপ্ত সেই রাতের স্মৃতি এখনও পিছু ছাড়ছে না মন্টুর। পরিবারের দাবি, তিনি কার্যত আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে রয়েছেন। রাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠছেন। মন্টুর ভাই ঝন্টু মণ্ডল বলেন, দাদা এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। ও বলছে, সবকিছু এত দ্রুত আর নিখুঁতভাবে হয়েছে যে বিশ্বাসই করা যাচ্ছে না। সিনেমার দৃশ্য নয়, পরিকল্পনা করে চালানো অপারেশন। এদিকে তদন্তকারীদের একাংশেরও অনুমান, গোটা হামলাটি ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত। কয়েক সেকেন্ডে ‘অপারেশন’ সেরে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় আততায়ীরা। আর সেই রক্তাক্ত রাতের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী মন্টু, এখনও আটকে রয়েছেন গুলির শব্দ আর রক্তস্নাত স্মৃতিতে। 
  • Link to this news (বর্তমান)