• চন্দ্রনাথ খুনের তদন্তে কি সিবিআই
    আনন্দবাজার | ০৯ মে ২০২৬
  • দু’দিন পরেও গ্রেফতারি শূন্য! জানা গেল না একাধিক প্রশ্নের উত্তর। এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথের খুনের ঘটনায় তদন্তের ভার সিবিআই-এর হাতে যেতে চলেছে বলে সূত্রের খবর। এ বিষয়ে পুলিশের তরফে অবশ্য সরাসরি কিছু জানানো হয়নি।

    শুক্রবারেও ধোঁয়াশা কাটেনি, ঠিক কত জন এই ‘অপারেশন’ চালিয়েছে? কার বা কাদের পরিকল্পনায় এই ঘটনা ঘটেছে? কতগুলি গাড়িই বা ব্যবহার করা হয়েছে? পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে আততায়ীরা পালিয়েছেই বা কোন পথে? নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি, ঠিক কোন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল চন্দ্রনাথকে খুন করতে। এ ব্যাপারে দিনভর পুলিশের তরফে স্পষ্ট কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। রাজ্য পুলিশ সূত্রের খবর, বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ গঠন করে তদন্ত চললেও নতুন সরকার গঠন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরও কিছু পদক্ষেপ করা হতে পারে।

    তদন্তে শুক্রবার বেশ কয়েকটি নতুন তথ্য সামনে এসেছে। খুনের ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছে সন্দেহে আরও একটি মোটরবাইক পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে। বারাসতের ১১ নম্বর রেলগেটের কাছ থেকে পাওয়া ওই মোটরবাইকটি দমদম এলাকার এক বাসিন্দার বলে তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ। দু’মাস আগে বাইকটি চুরি যায় বলে তিনি থানায় অভিযোগ করেছিলেন। এই চুরির বাইক কী করে আততায়ীদের হাতে পড়ল, ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও একটি ‘সেডান’ গাড়ির ভূমিকা। খুনের তদন্তে কয়েকশো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ লাল রঙের ওই গাড়িটিকে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু সেটির হদিস এখনও পায়নি। প্রাথমিক তদন্তের পরে পুলিশের ধারণা, ওই গাড়িতেই আততায়ীরা চম্পট দিয়ে থাকতে পারে। রাত পর্যন্ত খবর, এই ঘটনায় সাত থেকে আট জন জড়িত বলে মনে করছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দু’জন ‘শার্প শুটার’ এবং এক জন ‘টিপার’। এই টিপার কোনও একটি গাড়ি থেকে অনবরত চন্দ্রনাথের অবস্থান সম্পর্কে শুটারদের তথ্য জুগিয়ে গিয়েছে। তার জন্যই এক মিনিটের কম সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা মাফিক খুন করে বেরিয়ে গিয়েছে আততায়ীরা।

    তদন্তে কলকাতা পুলিশ ও বিধাননগর পুলিশের পাশাপাশি ব্যারাকপুর ও হাওড়া পুলিশের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ সূত্রের খবর, ঘটনার দিন নিজাম প্যালেস থেকে মধ্যমগ্রামের দিকে রওনা হয়েছিলেন চন্দ্রনাথ। ওই সময়ে সন্দেহজনক কোনও গাড়ি তাঁর পিছু নিয়েছিল কি না, সেটাই সিসি ক্যামেরার ফুটেজে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। এই পথে বিমানবন্দরের আড়াই নম্বর গেট হয়ে যেহেতু যেতে হয়, তাই বিধাননগর পুলিশকেও সক্রিয় হতে বলা হয়েছে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সন্দেহজনক একটি গাড়ি নিমতা এলাকায় দেখা গিয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রের খবর। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে সেই তথ্য মিলেছে। নিমতা এলাকায় যেতে ব্যারাকপুরের দিক থেকে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যেমন যাওয়া যায়, তেমনই ডানকুনি বা খড়্গপুরের দিক থেকেও যাওয়া যায়। এই পথে বালি সেতু ধরে দক্ষিণেশ্বর, বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে নিমতায় ঢোকা যায়। প্রাথমিক ভাবে তদন্তকারীরা মনে করছেন, দ্বিতীয় পথেই গাড়িটি প্রথমে নিমতা গিয়েছিল। তাই নিবেদিতা সেতু বা বালি ব্রিজ ধরে আসার রাস্তায় পেট্রল পাম্প, টোল প্লাজা-সহ বিভিন্ন জায়গার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    পুলিশ সূত্রের খবর, চন্দ্রনাথের খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই ভিনরাজ্যে গিয়েছেন বিশেষ তদন্তকারী দলের সদস্যেরা। সেই সূত্রে ভিন রাজ্যের পেশাদার খুনিদের তালিকা তৈরি করে তাদের গতিবিধি জানার চেষ্টা চলছে। চন্দ্রনাথকে যে ভাবে খুন করা হয়েছে, সেই ধরন অতীতের কয়েকটি খুনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এই প্রসঙ্গেই উঠে আসছে ব্যবসায়ী অজয় মণ্ডলকে খুনের ঘটনা। ২০২৪ সালে বেলঘরিয়ার বিটি রোডে অজয়ের গাড়ি ধাওয়া করে এসে তাঁকে গুলি করে পালায় দু’টি মোটরবাইকে থাকা আততায়ীরা। একই ভাবে ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের আগে ব্যারাকপুরে খুন হন মণীশ শুক্ল নামে এক যুবক। তাঁকেও রাস্তা আটকে খুন করা হয়। ২০২৩ সালে আসানসোলের হোটেল ব্যবসায়ী তথা কয়লা পাচারের মামলায় জড়িত রাজু ঝা-কে খুনের কায়দাও ছিল একই রকম। এই সূত্রেই পুলিশের একটি অংশ বর্তমানে জেলবন্দি সুবোধ সিংহের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে শুরু করেছেন। জেলে বসেই মোবাইল ফোনে সে তার কাজকর্ম চালায় বলে অতীতে একাধিক বার সামনে এসেছে। এই ঘটনায় উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের কোনও ‘সুপারি কিলার’ সুবোধের নির্দেশে এই কাজ করেছে কি না, দেখা হচ্ছে।

    পুলিশকে চন্দ্রনাথের মামা কৌশিক দাস আবার জানিয়েছেন, ভোটের চার-পাঁচ দিন পরেই চন্দ্রনাথকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। খুনের দিন দুপুরে পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে বিজেপি-র সভায় চন্দ্রনাথের সঙ্গে কৌশিকের দেখা হয়। কৌশিকের বক্তব্য, ‘‘ভোটের পরে চন্দ্রনাথের কাছে দু’টি ওয়টস্যাপ নম্বর ও একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে উল্টোপাল্টা লেখা এসেছিল। তবে নম্বর ট্র্যাক করতে পারছিল না চন্দ্রনাথ। আইবি, ডিআইবি ও জেলা পুলিশ সুপারকে সব জানিয়েছিল চন্দ্রনাথ। এ দিকটাও তদন্ত করে দেখা হোক।’’

    এ দিকে ইএম বাইপাসের ধারের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চন্দ্রনাথের গাড়িচালক বুদ্ধদেব বেরার শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে জানা গিয়েছে। তবে তিনি বিপন্মুক্ত নন। তাঁর কাঁধের কাছে হাড়ের মধ্যে যে গুলি ঢুকেছিল, সেটি বার করা হয়েছে। তাঁকে শল্য বিভাগের আইসিইউ-তে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। প্রকাশ্যে এসেছে সে দিন চন্দ্রনাথের গাড়িতেই থাকা আর এক যুবকের দাদার বয়ান। তিনি বলেছেন, ‘‘আমার ভাই কোনও মতে বেঁচে গিয়েছে। ওদের উপরে গুলি চলেছে দেখার পরেও কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেননি। উল্টে তাঁরা মোবাইল ফোনে ভিডিয়ো তুলতে ব্যস্ত ছিলেন। আরও আগে সাহায্য পাওয়া গেলে চন্দ্রনাথকে বাঁচানোর চেষ্টা করা যেত।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)