চার মাস ধরে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে কেমোথেরাপি চলছিল সোদপুরের বাসিন্দা, পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তির। ই এম বাইপাসের বেসরকারি হাসপাতালে শুক্রবার সেই পরিষেবা নিতে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন, তৃণমূল সরকারের ওই প্রকল্পে আর পরিষেবা মিলবে না। কেমোথেরাপি নিতে হলে নগদে ৩৮-৪০ হাজার টাকা দিতে হবে! শেষে ওই রোগীর পরিজনেরা নিজেদের পরিচিতদের মাধ্যমে কিছু ছাড় পেলেন। তবে, দিতে হল কয়েক হাজার টাকা। রোগীর ছেলের কথায়, ‘‘বুঝতে পারছি না, এর পরে কী করব? প্রতি বার তো ছাড় মিলবে না।’’
একই অবস্থা নদিয়ার বাসিন্দা, কিডনির অসুখে আক্রান্ত আর এক বৃদ্ধার। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে তাঁর ডায়ালিসিস চলত স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে। পরিজনেরা জানাচ্ছেন, এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতালে ঘুরলেও সর্বত্রই জানানো হয়েছে, এখন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বিনামূল্যে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যসাথীর জায়গা কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প নেবে কিনা, কিংবা নিলেও তা কবে হবে, তা নিয়েও স্পষ্ট দিশা নেই কারও কাছেই।
সম্প্রতি রাজ্যে পালাবদলের পরে এখন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প নিয়ে আতান্তরে পড়েছেন অসংখ্য রোগী। জেলার মাঝারি বা ছোট নার্সিংহোম থেকে শহরের বড় বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানেন না যে, ওই প্রকল্পে পরিষেবা দিলে টাকা আদৌ মিলবে কিনা। তাই সরকারি ভাবে প্রকল্প বন্ধের কোনও নির্দেশ এখনও পর্যন্ত না থাকলেও, রয়েছে অনিশ্চয়তা। জেলার এক নার্সিংহোমের মালিকের কথায়, ‘‘পরিষেবা দিতে অসুবিধা নেই। যদি প্রকল্পই আর না থাকে, তা হলে টাকা পাব না। তাই ঝুঁকি নিতে পারছি না।’’
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, প্রতিদিন প্রায় ৬০০০ রোগী স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সুবিধা পান। পরিষেবা বাবদ দৈনিক প্রায় আট কোটি টাকার বিল জমা পড়ে স্বাস্থ্য দফতরে। জানা যাচ্ছে, ৮ এপ্রিল পর্যন্ত জমা পড়া বিলের টাকা ইতিমধ্যেই প্রদান করা হয়েছে। তার পর থেকে বিল বকেয়া রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আর পরিষেবা দিলে টাকা মিলবে কি? তাই ৪ মে সরকার পরিবর্তন নিশ্চিত হতেই শহর থেকে জেলার অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নেওয়া বন্ধ করেছে।
বেসরকারি হাসপাতাল অ্যাসোসিয়েশনের পূর্বাঞ্চলীয় সভাপতি রূপক বড়ুয়া বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বন্ধের সরকারি নির্দেশিকা এখনও নেই। কিন্তু পরিষেবা দিলে টাকা কে দেবে, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘তাই কোনও কোনও হাসপাতাল স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নিচ্ছে না। কেউ আবার নিয়ন্ত্রিত পরিষেবা দিচ্ছে। আশা করছি, নতুন সরকার শীঘ্রই সংশয় দূর করবে।’’
একই সুর ‘প্রোগ্রেসিভ নার্সিংহোম অ্যান্ড হসপিটাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর রাজ্য সভাপতি শেখ আলহাজউদ্দিনের। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা তো কোনও দলীয় প্রকল্পে কাজ করিনি। সরকারি প্রকল্পে পরিষেবা দিয়েছি। তাই নতুন সরকার তা দেখে পদক্ষেপ করবে আশা করছি।’’ তিনিও দাবি করেছেন, প্রতিটি হাসপাতাল বা নার্সিংহোম নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সংগঠনগত ভাবে কিছু বলা হয়নি। যদিও বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে কেমোথেরাপি, ডায়ালিসিসের মতো জরুরি পরিষেবা তাঁরা বন্ধ করেননি। তবে পূর্ব পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার বা অন্য অসুখে ভর্তির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নেওয়া হচ্ছে না। রাজ্যের এক স্বাস্থ্যকর্তার কথায়, ‘‘প্রকল্প তো বন্ধ হয়নি। তবে, সেটা আয়ুষ্মান ভারতের সঙ্গে মিলে যাবে, না কি অন্য কিছু হবে, সেটা সরকার গঠনের পরে ঠিক হবে।’’
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কী, তা ঠিক করবে নতুন সরকার। কিন্তু যত দিন তা না হচ্ছে, রোগীদের ভোগান্তি নিরসনের পথ কী? সেই উত্তর অবশ্য মিলছে না কারও কাছেই।