• ব্রিগেডের মঞ্চে অতিথি মাখনলাল সরকার, পা ছুঁয়ে প্রণাম মোদীর, জানেন তাঁর পরিচয়?
    এই সময় | ০৯ মে ২০২৬
  • বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠান উপলক্ষে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে আয়োজন হয়েছিল জমকালো এক সভার। শুক্রবার সেই সভামঞ্চে তৈরি হলো একাধিক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্ত। তেমনই এক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল কলকাতা। সেই সভার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নবতিপর এক বৃদ্ধকে সম্মান জানিয়ে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। শপথ মঞ্চে আগত এই অতিথির পরিচয় নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই ছড়ায় কৌতূহল। তাঁর নাম ঘোষণার পরে এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় দিতেই স্পষ্ট হয় বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের শপথের মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

    ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম সহযোগী ছিলেন মাখনলাল সরকার নামে এই বৃদ্ধ। বলতে গেলে শ্যামাপ্রসাদের শেষ জীবনের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শিলিগুড়ির বাসিন্দা ও বিজেপির আদি যুগের লড়াকু সৈনিক মাখনলাল। বিজেপি কর্মীদের দাবি, কাশ্মীর আন্দোলনের সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক সফরেরও সঙ্গী ছিলেন এই প্রবীণ নেতা। কাশ্মীরে তেরঙা পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক অভিযানের পরে গ্রেপ্তার হন শ্যামাপ্রসাদ। কাশ্মীরের জেলে জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতার রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয়। সেই সময়ে তাঁর সঙ্গেই জেলবন্দি ছিলেন এই নবতিপর মাখনলাল।

    শপথ মঞ্চে নিজের ভাষ্যে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘১৯৫২ সালে কাশ্মীরে আন্দোলনের সময় মাখনলাল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শেষ জীবনেও ঘনিষ্ঠ অংশ ছিলেন।’ গেরুয়া শিবিরের মতে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলায় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে ভিত গড়ে উঠেছিল, মাখনলাল সরকার ছিলেন সেই প্রজন্মের অন্যতম মুখ।

    দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মাখনলাল উত্তরবঙ্গে বিজেপির সংগঠন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠনের পর তাঁকে পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং অঞ্চলের সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হাজার হাজার সদস্য সংগ্রহ করে উত্তরবঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। পরে তিনি শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলার প্রথম বিজেপি সভাপতি হন। টানা সাত বছর জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলেছিলেন মাখনলাল।

    বিজেপির এই প্রবীণ সৈনিকের জীবনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরেন শমীক ভট্টাচার্য। তিনি জানান, কংগ্রেস আমলে দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার জন্য দিল্লি পুলিশ মাখনলাল সরকারকে গ্রেপ্তার করেছিল। আদালতে বিচারক তাঁকে ক্ষমা চাইতে বললে তিনি তা অস্বীকার করেন। বরং আদালতেই আবার সেই গান গেয়ে শোনান। পরে বিচারক তাঁকে সম্মান জানিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য প্রথম শ্রেণির টিকিট ও ১০০ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

    প্রচার পর্ব থেকে জয়ের পরে বার বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের মুখে শোনা গিয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা। বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্নপূরণ হয়েছে বলে দাবি করে গেরুয়া শিবির। আজ সেই সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে শ্যামাপ্রসাদের ছায়াসঙ্গীকে মঞ্চে সংবর্ধনা জানিয়ে সেই বৃত্তই সম্পূর্ণ করল বিজেপি। বাংলায় বিজেপির প্রথম সরকার গঠনের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মাখনলাল সরকারের মতো প্রবীণ কর্মীকে সামনে আনা দলীয় আবেগ ও সংগঠনের ইতিহাসকে তুলে ধরারই প্রচেষ্টা।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলায় বিজেপির প্রথম সরকার গঠনের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মাখনলাল সরকারের মতো প্রবীণ কর্মীকে সামনে আনা দলীয় আবেগ ও সংগঠনের ইতিহাসকে তুলে ধরারই প্রচেষ্টা। এ দিন পা ছুঁয়ে কেবল এক বৃদ্ধকে সম্মান জানাননি প্রধানমন্ত্রী, বরং বাংলার মাটিতে বিজেপির যে আদি লড়াইয়ের ইতিহাসকে কুর্নিশ করেছেন তিনি।

  • Link to this news (এই সময়)