• গায়ত্রী মন্ত্রে বাংলার দুই যুগ, এক গায়ত্রীর কন্যা থেকে অন্য গায়ত্রীর পুত্র
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ১০ মে ২০২৬
  • গায়ত্রী মন্ত্রকে হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র বৈদিক মন্ত্র বলা হয়। ঋগ্বেদে উল্লিখিত এই মন্ত্র জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং আলোর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে ‘গায়ত্রী মন্ত্র’ যেন এক নতুন অর্থ খুঁজে পেল। কারণ পশ্চিমবঙ্গের গত দুই দশকের দুই প্রধান রাজনৈতিক মুখ— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী— দু’জনের জীবনেই এক আশ্চর্য মিল রয়েছে। দু’জনেরই মায়ের নাম গায়ত্রী।

    এক গায়ত্রীর কন্যা দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলা শাসন করেছেন। অন্য গায়ত্রীর পুত্র সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপের মধ্যেও এই অদ্ভুত সমাপতন এখন চর্চার কেন্দ্রে।

    প্রসঙ্গত, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনে তাঁর মা গায়ত্রী দেবীর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। মমতা একাধিকবার বলেছেন, তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের ভিত তৈরি হয়েছিল মায়ের শিক্ষায়। কালীঘাটের সাধারণ সংসারে অভাবের মধ্যেও যে লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল গায়ত্রী দেবীর।

    মমতা যখন বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময় পার করছিলেন, তখন ঘরে ফিরে মায়ের স্নেহই ছিল তাঁর প্রধান আশ্রয়। রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যস্ততার মধ্যেও মায়ের হাতে তৈরি সাধারণ খাবার খেয়েই ফের আন্দোলনের ময়দানে নেমে পড়তেন তিনি।

    ২০১১ সালে মমতা যখন প্রথমবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন গায়ত্রী দেবী বার্ধক্যের দিকে এগোলেও মেয়ের সাফল্যে তাঁর মুখের হাসি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। সেই বছরের শেষেই তাঁর প্রয়াণ ঘটে। মায়ের মৃত্যুর পরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও মমতা বারবার বলেছেন, তিনি আজও মায়ের আদর্শকেই পথপ্রদর্শক হিসেবে মানেন।

    অন্যদিকে, নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মা গায়ত্রী দেবী দীর্ঘদিন ধরেই অধিকারী পরিবারের অন্যতম স্তম্ভ। তিনি জনসমক্ষে খুব বেশি না এলেও পরিবারের ভিত শক্ত করে ধরে রেখেছেন তিনিই। এখনও অধিকারী পরিবারের ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু গায়ত্রী দেবী। ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল নিয়ে তিনি আগেই আশাবাদী ছিলেন। বাড়ির ছাদের গাছে পদ্মফুল ফোটাকে তিনি শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন বলেও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে।

    রাজনীতির ময়দানে শুভেন্দু যতই কঠোর এবং আক্রমণাত্মক নেতা হিসেবে পরিচিত হোন না কেন, মায়ের কাছে তিনি এখনও অত্যন্ত সাধারণ মানুষ। গায়ত্রী দেবী জানিয়েছেন, শুভেন্দু এখনও সাধারণ খাবারেই সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ। ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় আচার, বাগান পরিচর্যা এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা তিনি পরিবারের কাছ থেকেই পেয়েছেন।

    উল্লেখ্য, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই পালাবদলের সঙ্গে এমন আবেগঘন এবং প্রতীকী মিল সচরাচর দেখা যায় না। এক গায়ত্রীর কন্যা দীর্ঘ দেড় দশক বাংলার প্রশাসনিক শীর্ষে ছিলেন। এখন অন্য গায়ত্রীর পুত্র সেই স্থান দখল করেছেন।

    রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমাপতন নিছক কাকতালীয় হলেও বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর আলাদা আবেগ রয়েছে। কারণ বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় পরিবার, সংস্কৃতি এবং আবেগ সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। একদিকে কালীঘাটের সাধারণ ঘরের লড়াকু কন্যা, অন্যদিকে কাঁথির রাজনৈতিক পরিবারের পুত্র— দুই ভিন্ন পথের দুই নেতাকে আজ যেন এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে ‘গায়ত্রী’ নামটি।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)