• বিজেপি করার ‘অপরাধে’ খুন ত্রিলোচন-দুলাল! দল ক্ষমতায় আসায় বিচার-প্রত্যাশী পুরুলিয়ার সেই পরিবার
    প্রতিদিন | ১০ মে ২০২৬
  • চিত্র ১: বলরামপুর-বরাবাজার সড়কপথ থেকে বাঁদিকে চলে গিয়েছে সুপুরডি গ্রাম। কিছুটা এগিয়ে যেতেই মৃত ত্রিলোচন মাহাতোর মূর্তি। পাশেই পতপত করে উড়ছে পদ্মের পতাকা। উল্টোদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বড় হোর্ডিং। সেখানেই মাচায় বসে মোবাইলে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান দেখছেন ওই গ্রামের মানুষজন।

    চিত্র ২: বলরামপুর-বাঘমুন্ডি সড়কপথে মাইল ফলকে লেখা – ডাভা ১ কিমি। কিছুটা এগোতেই চারপাশ বিজেপির পতাকায় ছয়লাপ। ডানদিকে মৃত দুলাল কুমারের মূর্তি। গেরুয়া আবিরে মাখামাখি স্ট্যাচু।

    আজ থেকে ৮ বছর আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পুরুলিয়ার বলরামপুরের দুই বিজেপি কর্মীর ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল রাজ্য। এমনকি জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনায় ছিল এই দুই হত্যাকাণ্ড। কারণ, বিজেপি একেবারে প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছিল, খুন করে ওই দুই বিজেপি কর্মীর মৃতদেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই জোড়া হত্যাকাণ্ডে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। ‘শহিদ’ ত্রিলোচনের খুনে ধরপাকড়ও হয়েছিল। আর দুলাল কুমারের ঘটনাকে শেষমেষ বলা হয়েছিল ‘আত্মহত্যা’। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ধামাচাপা পড়ে যায়। আজ, রাজ্যে পালাবদলে বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণে যেন ছেলেদের খুনের ক্ষতয় কিছুটা প্রলেপ পড়ল। ওই দুই পরিবারই চাইছেন, বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে, দোষীদের ফাঁসি হোক। আগেকার সিআইডি তদন্তে সন্তুষ্ট নন তাঁরা। এই দুটি ঘটনায় সিবিআই তদন্ত চাইছেন।

    দুই তরতাজা তরুণ। বলরামপুরের সুপুরডি গ্রামের বাসিন্দা ত্রিলোচন মাহাতো। ১৮ বছরের বিজেপির যুব মোর্চার কর্মী। আরেকজন ৩০ বছরের দুলাল কুমার। বলরামপুরের ১৯৩ ডাভা-গোপলাডি ২ নম্বর বুথের বিজেপি বুথ সভাপতি। বিজেপি অন্তপ্রাণ বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলেন এই দুই ‘শহিদ’। ২০১৮ সালের ২৯ মে ত্রিলোচন মাহাতো সাইকেলে গিয়েছিলেন বলরামপুর হাট। সন্ধ্যা নেমে যাবার পরেও আর বাড়ি ফেরেননি। ফলে খানিকটা চিন্তা হচ্ছিল পরিবারের। ত্রিলোচনকে ফোন করে পাওয়া যায়নি। রাত বাড়তে থাকলে মেজদা শিবনাথ মাহাতোকে ফোন করেন ত্রিলোচন। বলেন, ‘‘কেউ বা কারা নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। বোধ হয় মেরে ফেলবে।”

    ভাইয়ের কথা শুনে শিবনাথ চমকে উঠেছিলেন। ফোন কেটে যাওয়ার পর কল করলেও আর পাওয়া যায়নি ত্রিলোচনকে। পরিবার-সহ গ্রামের মানুষজনকে জানানোর পর তন্নতন্ন করে আশেপাশের এলাকায় খোঁজা হয় ত্রিলোচনকে। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। তার মোবাইলের লোকেশন অনুযায়ী পুলিশও খুঁজতে থাকে। খোঁজ চলতে থাকে গ্রামবাসীদের। কিন্তু ভোরের আলো ফুটতেই গ্রাম থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে খুঁদিগোড়া গ্রামে ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার হয় তার। টি-শার্টে লেখা ছিল, “১৮ বছর বয়সে বিজেপির রাজনীতি। এবার তোর প্রাণ নীতি।” গাছের নিচে তার মোবাইল এবং সেই সঙ্গে একটি পোস্টার। যাতে লেখা “বিজেপি করা, এবার বোঝ।” এমন ঘটনায় টুইট করেছিলেন বর্তমানে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

    ত্রিলোচনের ঘটনার ঠিক তিনদিনের মাথায় ১ জুন রাত থেকে নিখোঁজ হয়ে যান বলরামপুরের ডাভা গ্রামের দুলাল কুমার। তার বাবা মহাবীর কুমারকে মুদি দোকানে রাতের বেলায় খাবার পৌঁছতে গিয়েছিলেন দুলাল। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল। সেখান থেকে তিনি ফাঁকা জায়গায় শৌচকর্ম করতে বসেছিলেন। তারপর আর ফেরেননি। রাতভর ওই গ্রামের মানুষজন মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে কার্যত চিরুনি তল্লাশি চালানোর পরেও দুলাল কুমারকে পাওয়া যায়নি। পরদিন আলো ফুটতেই সকালে বলরামপুর-বাঘমুন্ডি সড়কপথে হাইটেনশন লাইনে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ত্রিলোচনের বাবা হাঁড়িরাম মাহাতো বলেন, ‘‘ছেলেটার ছবি দেখলেই মনটা হু হু করে ওঠে। কত কষ্ট করে যে ছেলেটাকে মানুষ করেছিলাম। কলেজে ভর্তি করেছিলাম। বিজেপি করার জন্য তাকে মেরে ফেলল। আজ নতুন বিজেপি সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এই ঘটনার কিনারা হোক। যারা এই ঘটনায় দোষী তাদের ফাঁসি চাই।”

    একই দাবিতে সরব ওই এলাকার বুথ স্তর থেকে মন্ডল স্তরের নেতারাও। সুপুরডি বুথ সভাপতি ধনঞ্জয় মাহাতো বলেন, ‘‘আমরা দলকে ক্ষমতায় এনে দিয়েছি। এবার আমাদের বিচার চাই। নাহলে আমরা অন্যরকম আন্দোলন করব।” সামান্য চাষাবাদ ও প্রাণী পালন করে দিন গুজরান হয় এই পরিবারের। ত্রিলোচনরা চার ভাই। এদিন বড় ভাই বিবেকানন্দ মাহাতো দলীয় আমন্ত্রণে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে কলকাতায় গিয়েছিলেন। দুলালরা দুই ভাই। দুলালের বড় ছেলে আদিত্য কুমার ও খুড়তুতো ভাই কৃষ্ণপদ কুমার শনিবার গিয়েছিলেন শপথের অনুষ্ঠানে।

    দুলালের স্ত্রী মণিকা কুমার বলেন, ‘‘আজকের এই দিনটার জন্য ৮ বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি। মনে হচ্ছে যেন আজ আমার স্বামীর আত্মাটা শান্তি পেল। তবে এই ঘটনার অবিলম্বে কিনারা চাই। দোষীদের সকলকে ফাঁসি দিতে হবে।” দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কোনওভাবে সংসার চলে মনিকার। দুলালের খুঁড়তুতো দাদা রূপচাঁদ কুমারের কথায়, ‘‘এই ঘটনার বিচার না পেলে আমাদের মনটা শান্তি হবে না। আমরা বিজেপিকে জিতিয়েছি, ক্ষমতায় এসেছি। এবার খুনিদের ফাঁসি চাই।” এই আওয়াজ শুধু ওই দুই শহিদ পরিবারের নয়, সুপুরডি ডাভা-সহ সমগ্র জঙ্গলমহল বলরামপুরের।
  • Link to this news (প্রতিদিন)