চিত্রদীপ চক্রবর্তী
গ্লক –৪৭ এক্স।শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে খুনের ঘটনায় অস্ট্রিয়ায় তৈরি ওই একটি পিস্তল তদন্তকারীদের তো বটেই, এমনকী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের গোয়েন্দাদেরও চমকে দিয়েছে। কী করে আততায়ীদের হাতে ‘মহার্ঘ’ আগ্নেয়াস্ত্র এলো, সেই সূত্র ধরে এই ঘটনার সঙ্গে বাইরের দেশের যোগসূত্র খুঁজছেন তারা। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, বিশেষ সরকারি অনুমোদন প্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই পিস্তল শর্তসাপেক্ষে পেতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কিংবা অপরাধীরা চাইলেই গ্লক কিনতে পারেন না। বিশেষ করে আমাদের দেশে সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ছাড়া এই পিস্তল ব্যবহারের উপরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাহলে আততায়ীরা কোথা থেকে গ্লক পেল? শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের এক অফিসার বলেন,‘বাংলাদেশকে ব্যবহার করে বাইরের অন্য কোনও শত্রুদেশ এই খুনের পিছনে রয়েছে কি না, তাও আমরা খতিয়ে দেখছি।’ কেন বিষয়টি অতদূর পর্যন্ত ভাবা হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন তিনি। ওই আধিকারিকের কথায়,‘বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের যা পরিস্থিতি তাতে তৃণমূল ভোটের পরে পরিকল্পনা করে এ রকম ঘটনা ঘটাবে, এটা অন্তত আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। তাছাড়া টিএমসি নিজেরাই বিষয়টির সিবিআই তদন্ত দাবি করেছে। আর বিজেপির লোকেরা আচমকা কেন চন্দ্রকে টার্গেট করতে যাবে, তেমন যথাযথ যুক্তিও আমরা পাচ্ছি না। এক্ষেত্রে হাতে থাকে ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণ। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তদন্তে সে রকম কিছু ক্লু উঠে আসেনি।’
গোয়েন্দাদের যুক্তি, এই ধরনের ‘ডেসপারেট কিলিং’– মনোভাব দেখা যায় আননোন গানম্যানদের ক্ষেত্রে। চন্দ্রনাথকে যেভাবে মারা হয়েছে তাতে চারটি দিক খুব স্পষ্ট। এক, নিখুঁত প্ল্যানিং। এই খুনের পরিকল্পনা তিনদিন কিংবা একসপ্তাহের নয়। মাসখানেকের রেকি না করলে এমন অপারেশন করা সম্ভব নয়। কারণ, যে এলাকাটি খুনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, ঠিক সেই স্পটটি সিসিটিভি এলাকার বাইরে। দুই, টাইমিং। যে সময়ে তিনি বাড়ি ফেরেন, ঠিক সেই সময়ে স্ট্র্যাটেজিক লোকেশনে কাম তামাম করে ফেলার পদ্ধতি বেছে নিয়েছে অপরাধীরা। তিন,সুপারি কিলার। এভাবে খুন করার ক্ষেত্রে সুপারি কিলারদের যে ব্যবহার করা হয়েছে তা স্পষ্ট। সেই আততায়ীদের হয় উত্তরপ্রদেশ অথবা বাংলাদেশ থেকে আনা হয়েছে। আতিক আহমেদের সূত্র ধরে বহু আগে জানতে পারা গিয়েছিল আইএসআই কী ভাবে ইউপির দুষ্কৃতীদের ব্যবহার করে এদেশে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে ঠিক কতটা নিশ্চিত গোয়েন্দারা? সূত্রের খবর, মার্চ মাসের শেষের দিকে পাকিস্তান সীমান্তে বিএসএফ একটি অভিযান চালিয়ে দশটি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। তার মধ্যে তুরস্কে তৈরি ‘জিগানা’, আমেরিকার তৈরি ‘ব্যারেটা’, চিনের তৈরি ‘নোরিনকো’–র পাশাপাশি অস্ট্রিয়ায় তৈরি গ্লক ৪৭ এক্স পিস্তলও ছিল। এভাবে বাইরের দেশ থেকে আধুনিক অস্ত্র ভারতে অশান্তি পাকানোর জন্য ঢোকানো হচ্ছে। চন্দ্রনাথ যেখানে খুন হয়েছেন সেই মধ্যমগ্রাম এমনিতেই জাল পাসপোর্ট চক্রের জন্য পরিচিত। ফলে বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে ওই এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা এবং আশ্রয় নেওয়াও নতুন কোনও ঘটনা নয়।
কেন চন্দ্রকে খুনের পিছনে বাইরের কোনও শক্তিও কাজ করতে পারে? কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের ধারণা, এ রাজ্যকে সেফ করিডর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনগুলি। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে সেক্ষেত্রে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। বাংলার রাস্তা ব্যবহার করে ‘স্লিপার সেল’–এর সদস্যদের অন্য রাজ্যে যাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে আগামী দিনে। ফলে এমন একটা সময়ে এই ধরনের অপারেশন করা, যাতে সাধারণ মানুষ এবং পুলিশের দৃষ্টি পুরোপুরি রাজনৈতিক অভিমুখ নিয়ে নেবে, তার ফায়দা তোলা।
রাজ্য পুলিশ অবশ্য সবদিক খোলা রেখে খুনের ঘটনার তদন্ত করছে। শনিবার এক কর্তা জানান, চন্দ্রনাথের কাছে গোরু পাচার এবং কয়লা মাফিয়া সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ছিল। ফলে অভিযুক্তরা তথ্য–প্রমাণ লোপাট করার জন্য এই কাজ করেছে কি না, তাও আমরা খতিয়ে দেখছি।