• দেড় দশক পরে উড়ছে পতাকা, খুলছে তালাও, পার্টি অফিস পুনরুদ্ধারে বাম-কংগ্রেস
    এই সময় | ১০ মে ২০২৬
  • এই সময়: রাজ্যে ক্ষমতা বদল হতেই দিকে দিকে তৃণমূলের পার্টি অফিস দখলের অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। আবার পাল্টা অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূলও এই পার্টি অফিসগুলি একসময়ে দখল করেছিল। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, ক্ষমতায় না-থাকলেও বিজেপির জুতোয় পা গলিয়ে বাম দলগুলি এবং কংগ্রেস নিজেদের পাটি অফিস পুনরুদ্ধারে নেমেছে। উত্তরবঙ্গের নানা প্রান্তে সেই চিত্র ধরা পড়েছে।

    দক্ষিণ দিনাজপুর

    ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পার্টি অফিসেরও হাতবদল হচ্ছে। তৃণমূলের হাতে চলে যাওয়া কার্যালয় পুনরুদ্ধার করছে বামেরা। এমন ছবি দক্ষিণ দিনাজপুরে। ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারকে সরিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হতেই এক সময়ে তৃণমূলের দখলে যাওয়া পার্টি অফিস পুনর্দখল করছে বামফ্রন্ট। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট ও বাউলে এমন ঘটনা সম্প্রতি নজরে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে বালুরঘাট বাস স্ট্যান্ড চত্বরে থাকা আরএসপি-র ইউটিইউসি অনুমোদিত মোটর এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন ঘরের পুনর্দখল নেয় তারা। বালুরঘাট ব্লকেরই বাউলে থাকা কার্যালয়েরও পুনর্দখল নিয়েছে বামফ্রন্ট। এখন সেখানে সিপিএম ও আরএসপি-র দলীয় পতাকা উড়ছে। ২০১১-তে রাজ্যে ক্ষমতা বদল হতেই বালুরঘাটের এই শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয় ও বাউলের পার্টি অফিস দখল করে তৃণমূল। এত বছর পার্টি অফিসগুলি পুনর্দখল করতে পারেনি বামফ্রন্ট। অবশেষে ক্ষমতার হাতবদল হতেই কার্যালয়ের রং বদলে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ইউটিইউসির জেলা যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বনাথ সাহা বলেন, '২০১১-তে ক্ষমতায় এসেই তৃণমূল আমাদের পার্টি অফিস দখল করে। ওই সময়ে জেলা জুড়ে আমাদের একাধিক পার্টি অফিস দখল করা হয়েছে। তার পরে শত চেষ্টা করেও সেগুলি আমরা নিজেদের হাতে নিতে পারিনি।'

    গত ৪ মে ফলপ্রকাশের পরে বিজেপির পতাকা লাগিয়ে দেওয়া হয়। নামিয়ে দেওয়া হয় বিজেপির পতাকা। তার পরে বামপন্থীরা সেখানে লাল পতাকা উড়িয়ে দেন। বিশ্বনাথ বলেন, 'আইএনটিটিইউসি লেখা আমরা মুছে দিয়েছি। ওদের পতাকা নামিয়ে সেখানে ইউটিইউসি-র পতাকা তোলা হয়েছে, সংগঠনের নাম লিখে দেওয়া হয়েছে।' তৃণমূলের জেলা সভাপতি সুভাষ ভাওয়াল বলেন, 'আমি যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তখন এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। ২০১১-তে কী ঘটেছে আমার জানা নেই। নির্বাচনে যারা বিজেপিকে সহায়তা করেছে, তাদের সহায়তায় বামফ্রন্ট যদি পার্টি অফিস দখল নেয়, এতে বলার কিছু নেই।' বিজেপির জেলা সভাপতি স্বরূপ চৌধুরী বলেন, 'তৃণমূল দখলদারির রাজনীতি করত। বিজেপি এই নীতিতে বিশ্বাসী নয়। বর্তমানে বহু জায়গায় দেখা যাচ্ছে, বিজেপির নাম করে অন্য দলের পার্টি অফিস দখল নেওয়া হচ্ছে। যারা এটা করছে, তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

    জলপাইগুড়ি

    শাসকের পরাজয়ে দখল হয়ে যাওয়া পুরোনো পার্টি অফিস নিজেদের দখলে নিতে শুরু করল বামেরা। জলপাইগুড়ি সদর ব্লকে এই অফিসগুলির বেশিরভাগই পলাতক তৃণমূল নেতা কৃষ্ণ দাসের নেতৃত্বে করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তার মধ্যে রানিনগর শিল্পতালুক এলাকায় সিটুর অফিস, জয়পুর চা বাগানে থাকা আরএসপির ডুয়ার্স চা বাগান ওয়াকার্স ইউনিয়ন অফিস অন্যতম। মাঝে বেশ কিছু অফিস বিরোধীদের ফিরিয়ে দেওয়া হলেও কৃষ্ণ ও তাঁর দলবল ফের নিজেদের দখলে নেয়। ওই অফিস থেকেই গোটা শিল্প তালুক পরিচালনা করেতেন কৃষ্ণ। আইএনটিটিইউসি সদর-২ ব্লকের সভাপতি রাজু সাহানি বলেন, 'কৃষ্ণ দাস নিজের মর্জিমতো কাজ করতেন। ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানে সিপিএমের পার্টি অফিস ভেঙে দিয়েছিলেন। যা নিয়ে দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে বারোপাটিয়ায় পার্টি অফিস-সহ সদর ব্লকের ৬টি অফিস বামেরা নিজেদের দখলে নিয়েছে।' সিটু নেতা শুভাশিস সরকার বলেন, 'যে কটি অফিস তৃণমূল দখল করে রেখেছিল, পুনরায় আমরা দখল করেছি। সংগঠনের কর্মীরা বসা শুরু করেছেন।'

    আলিপুরদুয়ার

    বিভিন্ন জেলায় বামপন্থীরা যেমন কার্যালয় পুনরুদ্ধার করছেন, তেমনই তাঁদের অফিস বিজেপি দখল করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। আলিপুরদুয়ার জেলাতেই এই ঘটনা ঘটেছে। সিপিএমের ফালাকাটা বিধানসভার প্রার্থী কমলকিশোর রায় জানিয়েছেন, জটেশ্বর-১ গ্রাম পঞ্চায়েত ও এথেলবাড়িতে বিজেপি দু'টি কার্যালয় দখল করেছে। জটেশ্বর-১ গ্রামপঞ্চায়েতের অফিসটি পুনরুদ্ধার করেছেন বাম কর্মীরা। এথেলবাড়িতে দলের ঝান্ডা খুলে নিয়ে গিয়েছে দুষ্কৃতীরা। কমলকিশোর বলেন, 'আমরা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এথেলবাড়ির কার্যালয় উদ্ধারের চেষ্টা করছি। আমরা জেনেছি, পুলিশ বিজেপির উপরে চাপ তৈরি করছে। আমরা অপেক্ষা করছি কী সমাধান হয়।' সিপিএমের জেলা সম্পাদক কিশোর দাস বলেন, 'আগে তৃণমূল দখল করেছিল। এখন বিজেপি ক্ষমতায় এসে সেগুলো দখল করেছে। আমরা পরিস্থিতির উপরে নজর রেখেছি।' এরই মধ্যে পার্টি অফিস দখল ও উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে।

    আরএসপি-র জেলা সম্পাদক সুব্রত সরকার বলেন, 'আমাদের সম্পত্তি তো রক্ষা করতে হবে। আলিপুরদুয়ার-১ ব্লক এবং কুমারগ্রামের মারাখাতা ও কামাখ্যাগুড়িতে আমাদের অফিস দখল হয়েছিল। সেটা উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১১-তে তৃণমূল ক্ষমতায় এসে যে কার্যালয়গুলি দখল করেছিল, সে সব উদ্ধার করা হয়েছে। তবে খোয়ারডাঙায় তৃণমূল আমাদের যে কার্যালয় দখল করেছিল, এখনও তা উদ্ধার করা যায়নি। সেটা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে উদ্ধার করা হবে।' ডুয়ার্সের কালচিনি, মাদারিহাট, বীরপাড়াতে বাম শ্রমিক সংগঠনগুলির কার্যালয় ঠিকঠাক আছে।

    শিলিগুড়ি

    দুষ্কৃতীদের ভেঙে দেওয়া কার্যালয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বকে ফিরিয়ে দিলেন বিজেপির শিলিগুড়ি জেলা সভাপতি অরুণ মণ্ডল। গত ৪ মে ভোটের ফল ঘোষণার পরে ফাঁসিদেওয়ার ঘোষপুকুরে কয়েকজন দুষ্কৃতী বিজেপির ঝান্ডা হাতে তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়ে ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ। কার্যালয়টিতে তালাও ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে শুক্রবার শিলিগুড়ি জেলা সভাপতি সেখানে যান। তালা ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বকে পার্টি অফিস ফিরিয়ে দেন। জেলা সভাপতি বলেন, 'অন্য পার্টির কার্যালয় দখল বিজেপির সংস্কৃতি নয়। তোলাবাজি করাও নয়। তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বকে কার্যালয় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ থেকে এই এলাকায় সমস্ত ধরনের তোলাবাজি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হল। এর পরেও তা চললে প্রশাসন আইন মেনে পদক্ষেপ করবে।'

  • Link to this news (এই সময়)