• জয়পুরে পাঁচ হাজারে ঠেকেছে বামেদের ভোট, ধর্মীয় মেরুকরণের ভোট হয়েছে দাবি বাম প্রার্থীর!
    বর্তমান | ১০ মে ২০২৬
  • সংবাদদাতা, ঝালদা: একদা বামেদের অভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত পুরুলিয়ার জয়পুর বিধানসভা আজ আক্ষরিক অর্থেই গেরুয়া ঝড়ের কবলে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে বিজেপি প্রার্থী তথা কুড়মি নেতা অজিত মাহাতোর পুত্র বিশ্বজিৎ মাহাত বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু, ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি চর্চা শুরু হয়েছে বামেদের শোচনীয় পরাজয় নিয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জয়পুরে বামেদের ভোটব্যাংক যে তলানিতে ঠেকেছে, তা কেবল হারের গ্লানি নয়, বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের পতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বামেদের এই ধস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে বামেরা পেয়েছিল ১৯ হাজার ৪১৩টি ভোট। ২০২৬-এর ভোট শেষে সেই সংখ্যাটা অবিশ্বাস্যভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৮০৫-এ। অর্থাৎ, গত পাঁচ বছরে বামেদের নিজস্ব ‘পকেট ভোট’ বলে পরিচিত একটা বড়ো অংশই হাতছাড়া হয়েছে। অথচ ২০১১-র প্রবল পরিবর্তনের ঝড়েও জয়পুরে ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী ধীরেন্দ্রনাথ মাহাত জয়ী হয়ে নিজের জমি ধরে রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে আসনটি তৃণমূল ও পরে বিজেপির দখলে গেলেও বামেদের একটি সম্মানজনক ভোটব্যাংক ছিল। এবার সেই ভিতটাই কার্যত ধসে গিয়েছে।

    এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে প্রধানত ‘ধর্মীয় মেরুকরণ’-কেই দায়ী করেছেন বাম প্রার্থী তথা এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক ধীরেন্দ্রনাথ মাহাত। ফলাফল পর্যালোচনার পর অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে তিনি বলেন, এলাকায় সম্পূর্ণ ধর্মের ভিত্তিতে ভোট ভাগ হয়ে গিয়েছে। হিন্দু ভোট যেমন ঢালাওভাবে বিজেপির বাক্সে গিয়েছে, তেমনই সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশই গিয়েছে তৃণমূলের ঘরে। আমাদের উন্নয়নের রাজনীতি এই তীব্র মেরুকরণের তলায় চাপা পড়ে গেল। আমি নিজেও ভাবতে পারিনি যে এলাকায় দিনরাত মানুষের কাজ করি, সেখানে এত কম ভোট পাব! কারণ আমি যে এলাকাতেই প্রচারে গিয়েছিলাম সমস্ত জায়গাতেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছিল। আবার এলাকায় পরিবর্তনের ডাকও দিয়েছিল। তাতেই আমরা অনেকটা উজ্জীবিত হয়েছিলাম যে পরিবর্তন মানে হয়তো বামই আবার ফিরে আসবে।

    তবে শুধু মেরুকরণ নয়, পরাজয়ের গ্লানি স্বীকার করে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেও সামনে এনেছেন। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় কর্মীরা কিছুটা ‘কুঁড়ে’ বা অলস হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি বিজেপি ও তৃণমূলের বিপুল অর্থবল এবং শক্তির কাছে বামেদের প্রচার ও বুথ স্তরের ব্যবস্থাপনা টিকতে পারেনি বলে তাঁর অভিমত।

    রাজনৈতিক মহলের মতে, পরাজয়ের বীজ বপন হয়েছিল প্রার্থী নির্বাচনের সময় থেকেই। এলাকায় সিপিআই(এম)-এর একদল যুব নেতার সক্রিয়তা দেখে অনেকেই দাবি তুলেছিলেন যে এবার যেন ফরওয়ার্ড ব্লকের বদলে সিপিএম সরাসরি প্রার্থী দেয়। কিন্তু, বামফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে আসনটি ফরওয়ার্ড ব্লকের হাতেই থাকে। এনিয়ে দলের নীচুতলায় যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিফলন ইভিএম-এ পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

    জয়পুরের এই বিপুল জয়ে উচ্ছ্বসিত বিজেপি শিবির। বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য শ্রীপতি মাহাত বামেদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বামেদের অস্তিত্ব আজ ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। মানুষ ৩৪ বছরের অপশাসন ও নিপীড়ন ভোলেনি। জয়পুরের মানুষ পরিবর্তন চাইছিল, তাই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।

    ভোটের ফল বামেদের বিপক্ষে গেলেও ধীরেন্দ্রনাথবাবু ভেঙে পড়তে নারাজ। বিধানসভায় বামেদের প্রতিনিধি ফেরায় আশার আলো তিনি দেখছেন। তাঁর সাফ কথা, আমরা শুধু ভোটের রাজনীতি করি না। মানুষের পাশে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াই আমাদের কাজ।
  • Link to this news (বর্তমান)