নতুন সরকারের কাছে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত ‘রানিকুঠি’ ভবন সংস্কারের দাবি কৃষ্ণনগরবাসীর
বর্তমান | ১০ মে ২০২৬
অমিয়কুমার বিশ্বাস, কৃষ্ণনগর: শনিবার ২৫ বৈশাখ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালন করা হল। আবার এদিনই রাজ্যে পালাবদলের পর বিজেপি সরকার শপথ নিল। এদিন শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই কবিগুরুর গান, কবিতা, নাচ ও নাটকের মাতল বাঙালি। আর ঠিক সেই সময়েই কৃষ্ণনগরের বুকে নীরবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘রানিকুঠি’। সময়ের ভারে জীর্ণ এই হেরিটেজ ভবন আজ যেন অবহেলিত ও প্রশাসনিক উদাসীনতা প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্কারের অভাবে শতাব্দী প্রাচীন এই ভবন আজ প্রায় বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে।
এবারের রবীন্দ্রজয়ন্তী আরও একটি কারণে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনেই পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার গঠন হবে। তাই কৃষ্ণনগরের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ ও সাহিত্য অনুরাগীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তাঁদের দাবি রানিকুঠিকে কোনোভাবেই ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না। যেভাবেই হোক এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতেই হবে।
কৃষ্ণনগরের ডন বসকো রোড সংলগ্ন মেরি ইমাকুলেট হাসপাতালের কাছেই একটি বড় মাঠের এক প্রান্তে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন এই ভবন। এক সময়ের গৌরবময় অট্টালিকা আজ ভগ্নপ্রায়। ছাদের একাংশ বহু বছর আগেই ভেঙে পড়েছে। জীর্ণ হয়ে গিয়েছে দেওয়াল, দরজা ও জানলা। ভবনের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঝোপঝাড়, আগাছা ও লতাগুল্ম। ছাদের উপর ও দরজার মাথায় গজিয়ে উঠেছে বটগাছ। দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এটি একসময় বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস বহনকারী এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল।
স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, ২০১৮ সালে ওয়েস্টবেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন রানিকুঠিকে হেরিটেজ ভবনের স্বীকৃতি দেয়। সেই সময় শহরের মানুষ আশা করেছিলেন এবার হয়তো এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের পুনরুদ্ধার হবে। কিন্তু, হেরিটেজ স্বীকৃতি শুধুমাত্র কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। না হয়েছে সংস্কারের কাজ, না হয়েছে সংরক্ষণ। ফলে প্রতিদিন একটু একটু করে ধ্বংসের মুখে এগিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক রানিকুঠি। জানা গিয়েছে, একসময় এটি এক ইংরেজ সাহেবের বাসভবন ছিল। পরবর্তীতে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট দুর্গা দাসচৌধুরী কৃষ্ণনগরে এসে বাড়িটি কিনেছিলেন। এই চৌধুরী পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী। যিনি ‘বীরবল’ ছদ্মনামে বাংলা সাহিত্য জগতে অমর হয়ে আছেন। দুর্গা দাসচৌধুরীর সন্তানদের মধ্যে ছিলেন আশুতোষ চৌধুরী, কুমুদনাথ চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরী এবং প্রসন্নময়ী দেবী। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রামতনু লাহিড়ীর মতো বহু জ্ঞানীগুণী মানুষের আসা যাওয়া ছিল এই বাড়িতে।
জানা গিয়েছে, একবার জাহাজে যাত্রার সময় আশুতোষবাবুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। সেই সূত্রেই ১৮৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভাই হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভা দেবীর বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে কৃষ্ণনগরের এই চৌধুরী বাড়িতে এসেছিলেন। ফলে রানিকুঠি শুধুমাত্র একটি পুরনো বাড়ি নয়, এটি বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
পরবর্তীকালে বিংশ শতকের শুরুতে নদীয়া রাজবংশের মহারানি জ্যোতির্ময়ীদেবী এই বাড়িটি কিনে নেন। অনেকের মতে, সেই সময় থেকেই বাড়িটির নাম হয় ‘রানিকুঠি’। তারপর ধীরে ধীরে সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে থাকে তার জৌলুস।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রীতম রায় বলেন, রানিকুঠি শুধুমাত্র একটি পুরনো বাড়ি নয়, এটি বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। এটিকে রক্ষা করতেই হবে। বেশি দেরি করলে হয়তো ভবনটিকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না।
রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে তাই কৃষ্ণনগরের মানুষের আবেদন, নতুন সরকার যেন রানিকুঠিকে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।