• কাউন্সিলারদের আচরণে অসন্তুষ্ট দমদমের মানুষ, ৩৯ ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৮টিতেই হার
    বর্তমান | ১০ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: দমদমের কাউন্সিলাররা নিজেদের ওয়ার্ডে তৃণমূলের ভোট ধরে রাখার বিষয়ে ছিলেন চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ভোটের ফল বেরনোর পর দেখা গেল সে আত্মবিশ্বাস আদপে ছিল ফাঁকা আওয়াজ। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে তাঁদের বিরুদ্ধে যে বিস্তর ক্ষোভ জমেছিল তা টেরই পাননি কাউন্সিলাররা। ফলে দমদমের ৩৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৮টিতেই হার। শুধুমাত্র একটি ওয়ার্ডে জয় পেয়েছে তৃণমূল। 

    মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে অলিগলি ঘুরেছিলেন দমদমের বিজেপি প্রার্থী। শেষপর্যন্ত বদলের ঝড়ের হাওয়া পালে লাগে। তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে রাজ্যের পূর্বতন শাসক দলকে কার্যত দুরমুশ করে ফেলে বিজেপি। দমদম একসময় বামেদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি ছিল। ২০০৯ সাল থেকে লাল ফিকে হতে শুরু করে। তারপর দমদম চলে যায় তৃণমূলের দখলে। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে পর্যন্ত তাদের একাধিপত্য চোখে পড়ার মতো ছিল। গত ১০ বছর ধরে কোনো ওয়ার্ডে বিরোধীদের একজন কাউন্সিলারও ছিল না। কিন্তু এবারের ভোটে সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া ছবি। বিজেপির অরিজিৎ বক্সি ৯৯ হাজার ১৮১ ভোট পান। আর তৃণমূলের ব্রাত্য বসু যিনি রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি পান ৭৩ হাজার ৯০৮ ভোট। অরিজিৎ জেতেন ২০ হাজার ৫৭৬ ভোটে। সিপিএমের ময়ূখ বিশ্বাস পান ২০ হাজার ৫৭৬ ভোট। এই বিধানসভা কেন্দ্রে পড়ে দক্ষিণ দমদমের ১৭টি ওয়ার্ড। এবং দমদমের ২২টি ওয়ার্ড। মোট  ৩৯টি ওয়ার্ড। এর মধ্যে শুধুমাত্র ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে জয় পেয়েছে তৃণমূল।

    গত ১০ বছরে তৃণমূল বিরোধী কাউকে দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি। নির্বাচনের প্রচারেও তাঁদের তেমন ভিড় চোখে পড়েনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত হিসেব বদলে দিয়ে জিতে গিয়েছে বিজেপি।

    বাম জমানায় রাস্তায় নেমে লড়া প্রবীণ তৃণমূল নেতারা বলছেন, কাউন্সিলারদের বিরুদ্ধে মানুষের মাত্রাছাড়া ক্ষোভই পরাজয়ের মূল কারণ। গত দেড় দশকে পুরপিতাদের রকেট গতিতে উত্থান, মাত্রাছাড়া দাপট দেখানো, প্রমোটারি ও সিন্ডিকেটে মদত দেওয়ার কারণে মানুষ তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিল। একাধিক কাউন্সিলারের বিরুদ্ধে দলের কর্মীদের পর্যন্ত মারধর ও খুনের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে দলের মধ্যেও অনাস্থা তৈরি হয়। কর্মীরা আন্দোলন পর্যন্ত করে। সব দেখেও পুলিশ চুপ করে থেকেছে। এসব কারণে দলের মধ্যে ফাটল ধরা শুরু হয়। তা ক্রমশ চওড়া হয়। এই সবকিছুর ফল ফলেছে ইভিএমে। অভিযোগ এমনও যে, শহর তৃণমূল সভাপতি, ওয়ার্ড এবং বুথ সভাপতি কাউন্সিলারদের তল্পিবাহক হয়ে পড়েন। দলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পুরোপুরি কাউন্সিলারদের হাতে। অপছন্দের বহু পুরনো নেতা-কর্মীকে একঘরে করে দেওয়া হয়েছিল। আর দিন শেষে দেখা গিয়েছে, খেলা, মেলা, নানা ধরনের অনুষ্ঠান, বাড়িতে মিষ্টি-কেক পাঠানো ইত্যাদি করে মানুষের মন জয় করা যায়নি। তারই ফল দেখা গিয়েছে ফলাফলে। দমদমে তৃণমূলের পরিচিত নেতা প্রবীর পাল বলেন, ‘হারের কারণ দল পর্যালোচনা করবে।’

    এছাড়া তিনি বলেন, ‘আমি ২০২২ থেকে কাউন্সিলার পদে নেই। তবে কো-অর্ডিনেটর ও অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেছি। দমদমের বহু জায়গায় আমাদের কর্মীরা আক্রান্ত। পার্টি অফিস ভাঙচুর ও দখল হচ্ছে। হিংসা কখনও শেষ কথা বলে না।’ বিজেপির উত্তর শহরতলির সভাপতি চণ্ডীচরণ রায় বলেন, ‘তৃণমূলের দুষ্কৃতীরাজ, তোলাবাজি, প্রমোটারি, সিন্ডিকেট নিয়ে মানুষ তিতিবিরক্ত ছিল। পরিবর্তনের হাওয়ায় দমদমের মানুষ তৃণমূলকে জবাব দিয়েছেন।’ 
  • Link to this news (বর্তমান)