• তাঁতে বোনা মেখলায় বদলেছে গ্রামের অর্থ-চিত্র
    এই সময় | ১০ মে ২০২৬
  • বাসুদেব ভট্টাচার্য, ময়নাগুড়ি

    গ্রামে ঢুকলেই শোনা যায় খট খট শব্দ। একটি বা দু'টি নয়, অন্তত ৫০টি বাড়ি থেকে ওই শব্দ ভেসে আসে। খাতায়কলমে ওই গ্রামের নাম কাদোরবাড়ি। তবে খট খট শব্দের কারণে বর্তমানে লোকমুখে গ্রামের নাম হয়ে গিয়েছে 'তাঁতিপাড়া'। হবে না-ই কেন? এতগুলো পরিবার হাতে তাঁত বুনে রুটিরুজির বিকল্প উপায় খুঁজে পেয়েছে যে।

    দুই দশক আগেও ময়নাগুড়ির চূড়াভাণ্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ওই গ্রামের বাসিন্দারা মূলত চাষাবাদ করতেন। কাদোরবাড়ির এক বাসিন্দা বিপিন মণ্ডল বছর কুড়ি আগে নদীয়ায় গিয়ে তাঁতের কাজ শিখে কাদোরবাড়িতে ফিরে প্রথম তাঁত বোনা শুরু করেন। শুরুর দিকে নিজের হাতে বোনা মেখলা (এক ধরনের শাড়ি) বিক্রি করতেন নদীয়ায়। চাহিদা বাড়তে থাকায় এবং লাভজনক হওয়ায় গ্রামের অন্যরাও বিপিনের কাছে তাঁত বোনা শিখতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে বেশ কয়েকটি পরিবার বাড়িতেই তাঁত বুনতে শুরু করে। নদীয়ার পাশাপাশি অন্য জেলা এবং প্রতিবেশী রাজ্যেও মেখলার চাহিদা বাড়তে থাকায় লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন তাঁতিরা। আর তাতেই বদলে যায় গ্রামের চেহারা। বর্তমানে গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই পেশায় যুক্ত।

    চন্দ্রনাথ মণ্ডল নামে এক তাঁতি বলছেন, 'আমরা আগে চাষাবাদ করতাম। এখন তাঁত বুনে ভালো আয় হচ্ছে।' তিনি জানান, মেখলা তৈরি করতে 'ক্যাচা' এবং 'পাকুয়াম' নামে দুই ধরনের সুতো ব্যবহার করা হয়। কোচবিহারের দিনহাটা থেকে কাঁচামাল নিয়ে আসেন তাঁরা। মেখলা তৈরির পরে সেগুলি অসমের বিভিন্ন হাটে বিক্রি করেন। একটি মেখলা তৈরিতে খরচ হয় সাত-আটশো টাকা। অসমে সেই মেখলা বিক্রি হয় ২,০০০-২,২০০ টাকায়।

    গ্রামের তরুণ-তরুণীরাও এই পেশায় নিজেদের যুক্ত করছেন। দু'দিনে একটি মেখলা তৈরি করতে পারেন তাঁতিরা। আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে এক-একটি মেখলায় ১,০০০-১,২০০ টাকা লাভ হয় তাঁদের।

    তাঁতিদের মধ্যে রতন মণ্ডল, সুকুমার মণ্ডল বলছেন, 'চাষাবাদ একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তা নয়। তবে লাভ বেশি তাঁত বুনেই। বোনার পরে আমরা নিজেরাই অসমের গুয়াহাটির হাটে গিয়ে মেখলা বিক্রি করে আসি। কেউ কেউ কোচবিহারে গিয়ে অসমের পাইকারদের বিক্রি করে আসেন।' অসমের পল্টন বাজারে সবচেয়ে বেশি এই শাড়ি বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন তাঁরা। 'তাঁতিপাড়া'-র অর্থ-চিত্র আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদেরও তাঁত বোনায় উদ্বুদ্ধ করছে।

  • Link to this news (এই সময়)