এই সময়, পুরুলিয়া: শুধু দু’টি বিষয়ের পাঠ নেওয়া শিক্ষকের কাছে। বাকিটা অধ্যবসায়। এই দুইয়ের যুগলবন্দিতে সাঁওতালি মাধ্যমে রাজ্যে প্রথম পুরুলিয়ার কাশীপুরের লোহাট হাইস্কুলের ছাত্রী কুনামি কিস্কু। প্রাপ্ত নম্বর ৬১১।
কাশীপুর ব্লকের কালিদহ পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত গ্রাম জিওলগড়িয়া। সেই গ্রামের বাসিন্দা কুনামি। গ্রাম থেকে স্কুলের দূরত্ব আট কিলোমিটার। মেঠো পথ ভেঙে সাইকেল চালিয়ে প্রত্যেক দিন স্কুলে যাতায়াত। বাবা মানসিং কিস্কু পেশায় পার্শ্বশিক্ষক। লোহাট স্কুলেই পড়ান। মা দুলালী দেবী সংসার সামলান। আক্ষরিক অর্থেই নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা। মানসিং বলছেন, ‘ব্লক সদর কাশীপুর থেকে আমাদের গ্রাম কমবেশি ১৮–২০ কিলোমিটার দূরে। যাতায়াত ব্যবস্থা মোটেও ভালো নয়। বিকেল সাড়ে তিনটের পরে একটিই বাস মেলে। তা–ও দাঁড়ায় গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার দূরে। তাই বাইরে গিয়ে অন্য বিষয়গুলি স্যরদের কাছে পড়া ছিল না।’
কুনামি সাঁওতালিতে ৯৩, ইংরেজিতে ৭৬, গণিতে ৯৭, ভৌতবিজ্ঞানে ৮১, জীবন বিজ্ঞানে ৮৫, ইতিহাসে ৮৪ ও ভূগোলে ৯৫ নম্বর পেয়েছে। শিক্ষকের কাছে পাঠ নিয়েছে ইংরেজি ও গণিতে। গ্রাম থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে একটি কোচিং সেন্টার পড়ানো হতো গণিত। লড়াকু মেয়ে বলছে, ‘ অন্য কোনও বিষয়ের টিউশন নেওয়ার সুযোগ ছিল না। বাড়িতে নিজের মতো করে পড়েছি।’
কুনামির স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। বলছে, ‘বিজ্ঞান নিয়ে লোহাট স্কুলেই ভর্তি হব। তবে স্কুলের পরিকাঠামো ভালো নয়। মোট চারটি ক্লাস ঘর। বারান্দায় ক্লাস হয়। একটি ঘরেই দু’টি ক্লাস চলে। বৃষ্টি হলে বারান্দার ক্লাসও বন্ধ!প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, স্কুলের পরিকাঠামো নতুন ভাবে গড়া হোক। নিয়োগ হোক শিক্ষক-শিক্ষিকা।’
ওয়েস্ট বেঙ্গল সাঁওতালি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ–সম্পাদক শত্রুঘ্ন মুর্মু বললেন, ‘এ বার ৪৫টি সাঁওতালি মাধ্যম স্কুল থেকে ৪৩৪ জন মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছিল। প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্রী রাজ্যে প্রথম হয়েছে। এমন এক স্কুলের ছাত্রী, যার পরিকাঠামো বেহাল। প্রতিকূলতা অতিক্রম করে কুনামি রাজ্যে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছে। ওকে ধন্যবাদ।’ যোগ করেন, ‘রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আশা করব, এ বার স্কুলগুলিতে উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে উঠবে।’